দ্যা ডেইলি বাংলা নিউজ অনলাইন
পদ্মায় একসময় ছিল স্বচ্ছ পানির ধারা। এখন পানি আলকাতরার মতো কালো। রাজশাহী নগরীর বর্জ্য যাচ্ছে নদীতে। এটি ছাড়াও স্বরমঙ্গলা, বারাহী, নবগঙ্গা, বারনই ও হোজা নদী এবং এগুলোর সংলগ্ন অন্তত ছয়টি বিল দূষিত হচ্ছে নগরীর অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে।
হাসপাতাল এবং কারখানার বিষাক্ত বর্জ্যও যাচ্ছে নদীতে। এই পানি ব্যবহার করায় স্থানীয় বাসিন্দাদের শরীরে দেখা দিচ্ছে চর্মরোগ। দূষিত পানি কৃষি জমিতে ছড়িয়ে পড়ায় খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে।
পদ্মা ছাড়া অন্য পাঁচটি নদী ধীরে ধীরে বর্জ্যবাহী নালায় পরিণত হয়েছে। রাজশাহী নগরী ও আশপাশ দিয়ে বয়ে গেছে এগুলো। বারাহী নদী পদ্মা থেকে উৎপন্ন হয়ে শহরের ভেতর দিয়ে বায়া বাজার হয়ে বারনই নদীতে মিশেছে। একইভাবে স্বরমঙ্গলা ও নবগঙ্গা নদীর সব বিষাক্ত বর্জ্য শেষ পর্যন্ত পবা উপজেলার বায়া এলাকায় বারনই নদীতে গিয়ে পড়ছে। নদীর মোহনায় গিয়ে দেখা যায়, কুচকুচে কালো পানির ওপর ভাসছে প্লাস্টিক, পলিথিন আর কেমিক্যাল মিশ্রিত ফেনা। স্থানীয়দের দাবি, এই দূষণ নাটোরের চলনবিল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে।
পদ্মা থেকে নিউমার্কেটের কাছ দিয়ে বারাহী নদী বয়ে গেছে। নদীটি নগরীর মুন্নুজান স্কুলের পাশ দিয়ে পদ্মা থেকে উৎপন্ন হয়ে সিটি ভবনের পশ্চিম পাশ দিয়ে রেলভবন, পলিটেকনিক, বিজিবি ক্যাম্প হয়ে বায়াবাজার দিয়ে বারনই নদীর সঙ্গে মিলেছে। বারাহী নদীতে এক সময় পালতোলা নৌকা চলত। জেলেরা মাঝ ধরত। নদীটি এখন মৃত। সিটি করপোরেশনের সব বর্জ্য পানি ও মেডিকেল বর্জ্য এই মৃত নদীতে সরু খালের মতো প্রবাহিত হয়ে যাচ্ছে বারনই নদীতে। এলজিইডি ২০২৩ সালে নদীটির নাম পাকুরিয়া খাল হিসেবে উল্লেখ করে বায়া আফিনেপালপাড়ায় ২৪ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু করেছে। এই সেতুর নিচে মঙ্গলবার গিয়ে দেখা যায় শহরের কালো বর্জ্য পানি প্রবাহিত হয়ে মিশে যাচ্ছে বারনই নদীতে। বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশ্রিত পানিতে সাদা ফেনা বয়ে যাচ্ছে। পানি থেকে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। এই নদী প্রসঙ্গে গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, ‘এক পয়সা দিয়ে বারাহী নদী পার হয়ে স্কুলে যেতাম। নদীটি এখন শহরের বর্জ্য বয়ে যাওয়ার ড্রেন।’
ঝুঁকিতে কৃষক, জেলে ও নদীপারের মানুষ
পাকুরিয়া সেতুর নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে সাদা ফেনা ওঠা বর্জ্য পানি। এই পানি গিয়ে মিশছে বারনই নদীতে। সেতুর নিচে পেঁয়াজ ক্ষেতে কাজ করছিলেন কৃষক মোজাম্মেল হক। তিনি বলেন, ‘এটা বারাহী নদী। আগে এখানে বড় বড় মাছ হতো। পানি পরিষ্কার ছিল। চাষিরা জমিতে কাজ করতে গিয়ে ক্লান্ত হলে দুই হাতে তুলে এই পানি পান করত। কিন্তু এখন দূষণের কারণে মাছ, শামুক, ঝিনুক এমনকি সাপ পর্যন্ত মরে যায়।’
শুধু বারাহী নয়, দূষণ হচ্ছে আরও নদী ও বিল। নগরীর পূর্ব পাশের স্বরমঙ্গলা নদী রুয়েট ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝ দিয়ে খড়খড়ি, রামচন্দ্রপুরহাট হয়ে ফলিয়ার বিলে মিশেছে। এটিই পরে ফলিয়ার বিলে গিয়ে হোজা নদী নামে পরিচিতি পায়।
চর্মরোগে আক্রান্ত হাজার হাজার মানুষ
পবা উপজেলার বারনই নদীর কাছে গিয়ে দেখা যায়, নওহাটা শ্মশানঘাটের পাশ দিয়ে নদীতে পড়ছে বর্জ্য পানি। সাদা ফেনা ওঠা পানিতে কয়েকটি শিশু খেলা করছে। স্থানীয় জেলে সুমন হলদার বলেন, নদীর পানি শরীরে লাগলে দাউদ, একজিমাসহ নানা রকম রোগ হয়। পবার পুঠিয়াপাড়ার বাসিন্দা রিজিয়া বিবি এই পানি ব্যবহার করে চর্মরোগে আক্রান্ত হন। তাঁর বোন আঞ্জুয়ারা বেগম ও তাহেরা বেগম জানান, নদীর পানি ব্যবহার করতেন তারা। বাড়ির সবারই চুলকানি হয়।
পবা উপজেলার বারনই নদী এলাকার বাঁচার আশা সাংস্কৃতিক সংগঠনের সভাপতি মোস্তফা সরকার বিজলী দীর্ঘদিন ধরে নদীগুলো দূষণমুক্ত করার আন্দোলনে যুক্ত। তিনি বলেন, এই নদী বাঁচাতে হবে।
কারণ এর সঙ্গে লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। চাষিরা এখন মাছ পান না। তারা না জেনেই বিষাক্ত পানিতে ফসলে সেচ দিচ্ছেন। এই ফসল যারা খাবেন তাদেরও ক্ষতি হতে পারে।
নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, নদীগুলো এক সময় প্রবহমান ছিল। নৌকা চলত। বারাহী নদীতে এক পয়সা দিয়ে নৌকা পার হয়ে স্কুলে যেতাম। কিন্তু শহর বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় এসব নদী এখন খাল। খালগুলো দিয়ে শহরের সব বর্জ্য পানি বয়ে গিয়ে বারনই নদীতে মিশছে। এতে শুধু রাজশাহী নয়, বর্জ্য পানি নাটোরের চলনবিলে গিয়ে মিশে যাচ্ছে। এই এলাকার মাছ ও জলজপ্রাণীর আবাস ধ্বংস হচ্ছে।
চিকিৎসা দিতে পারছে না উপজেলা হাসপাতাল
পবা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বারনই নদীর পানি ভয়ংকর রকমের দূষিত। এই পানি যারা ব্যবহার করেন বা যারা মাছ ধরেন তারাই চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। কোনো পরিবারের একজন আক্রান্ত হলে সে পরিবারের সবাই আক্রান্ত হন। আমরা একটি পরিবারের ৯ জন আক্রান্ত সদস্য পেয়েছি। এর মধ্যে একজন মারা গেছেন। তারা বিভিন্ন চর্মরোগ যেমন স্ক্যাবিস, দাউদ, একজিমা, সোরিয়াসিসে একই সঙ্গে আক্রান্ত হচ্ছেন। পবা উপজেলায় তিনটি নদীর ঘাটে এমন অন্তত তিন হাজার রোগী আছেন। জেলা সিভিল সার্জন এসআইএম রাজিউল করিম বলেন, নদীর পানি ব্যবহার না করতে তারা মানুষকে সচেতন করছেন।
বর্জ্য পানি শোধনের নেই কোনো ব্যবস্থা
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শেখ মোহাম্মদ মামুন ডলার বলেন, ‘শহরের বর্জ্য নদীতে যাচ্ছে না, বর্জ্য পানি যাচ্ছে। এটা শুধু রাজশাহী নয়, সারাদেশের চিত্র। এ জন্য ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট বসাতে হবে। এটা কবে নাগাদ বসানো সম্ভব, তা আমার জানা নেই।’
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনার ড. আ ন ম বজলুর রশীদ বলেন, ‘শহরের বর্জ্য পানি শোধনের জন্য ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট বসানোর একটি প্রকল্প প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন হলেই কাজ শুরু হবে।’


