দ্যা ডেইলি বাংলা নিউজ অনলাইন
মানুষের সভ্যতার ইতিহাস মূলত পরিবর্তনের ইতিহাস। প্রতিটি বড় আবিষ্কার মানুষের জীবনযাত্রা, উৎপাদন পদ্ধতি এবং অর্থনীতিকে নতুন পথে নিয়ে গেছে। চাকা আবিষ্কার মানুষের চলাচলে এনে দিয়েছিল গতি, আর সেই গতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে প্রযুক্তির উন্নয়নে। শিল্পবিপ্লবের ধারাবাহিকতায় মানুষ যেমন উৎপাদনব্যবস্থাকে বদলে দিয়েছে, তেমনি কৃষিও ধীরে ধীরে প্রবেশ করেছে নতুন প্রযুক্তির যুগে।
শিল্পবিপ্লবের ইতিহাসে তিনটি বড় ধাপের কথা বলা হয়। ১৭৬০ সালে বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে প্রথম শিল্পবিপ্লবের সূচনা হয়েছিল। এর ফলে কারখানাভিত্তিক উৎপাদন শুরু হয় এবং মানুষের শ্রমের জায়গায় যন্ত্রের ব্যবহার বাড়তে থাকে। এরপর ১৮৭০ সালে বিদ্যুতের আবিষ্কার দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লবকে ত্বরান্বিত করে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহার শিল্প খাতে এনে দেয় অভাবনীয় গতি। উৎপাদন বাড়ে বহুগুণ, তৈরি হয় নতুন নতুন শিল্পকারখানা। ১৯৬০ সালের দিকে কৃষিতে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও বাংলাদেশের কৃষিতথ্যপ্রযুক্তির আবির্ভাব ঘটায় তৃতীয় শিল্পবিপ্লব। কম্পিউটার, ইন্টারনেট এবং স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি শিল্পক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করে।
উৎপাদনব্যবস্থায় আসে ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ। পৃথিবী যেন একটি বৈশ্বিক গ্রামে পরিণত হয়।
কিন্তু শিল্পের এই দ্রুত বিকাশের মধ্যেই কৃষি খাত অনেক সময় পিছিয়ে পড়েছে। অথচ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তি এই কৃষিই। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, লাঙলই ছিল কৃষির প্রথম যন্ত্র।
সেই লাঙল থেকেই শুরু হয়েছে কৃষিযান্ত্রিকীকরণের যাত্রা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, কম্বাইন হারভেস্টার, সেচযন্ত্র, থ্রেশারের মতো অসংখ্য যন্ত্র কৃষিকে দিয়েছে নতুন গতি।
আধুনিক বিশ্বে উন্নত কৃষি মানেই যন্ত্রনির্ভর কৃষি। জমি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে বীজ বপন, সার প্রয়োগ, আগাছা দমন, ফসল সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ প্রতিটি ধাপেই এখন যন্ত্রের উপস্থিতি অপরিহার্য। কৃষিতে শ্রমের ঘাটতি, উৎপাদন ব্যয়ের বৃদ্ধি এবং সময়ের চাপ সবকিছুই কৃষকদের যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে।
কিন্তু বর্তমান সময়ের কৃষি আর শুধু যন্ত্র ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এখন কৃষিতে প্রয়োজন আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার, স্বয়ংক্রিয়তা ও বুদ্ধিমান প্রযুক্তির ব্যবহার। এখানেই আসে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ধারণা।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মূলত একটি ডিজিটাল ও বুদ্ধিমান প্রযুক্তির যুগ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস (খঙঞ), রোবটিক্স, ড্রোন প্রযুক্তি, বিগ ডেটা ও স্যাটেলাইট তথ্য এসব প্রযুক্তির সমন্বয়ে গড়ে উঠছে নতুন এক কৃষিব্যবস্থা। যেখানে যন্ত্র শুধু মানুষের নির্দেশ পালন করে না; বরং তথ্য বিশ্লেষণ করে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে ইতোমধ্যেই এই প্রযুক্তি কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে। ড্রোন উড়ে গিয়ে ফসলের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছে, কোথায় কী পরিমাণ সার বা পানি প্রয়োজন তা নির্ধারণ করছে। সেন্সর মাটির আর্দ্রতা মাপছে এবং সেই অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেচব্যবস্থা চালু বা বন্ধ হচ্ছে। এমনকি চালকবিহীন ট্রাক্টরও এখন অনেক দেশে বাস্তবতা।
মানুষ একসময় লাঙল দিয়ে কৃষির যাত্রা শুরু করেছিল। সেই যাত্রা আজ এসে পৌঁছেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের যুগে। ভবিষ্যতের কৃষি হবে আরও স্মার্ট, আরও নির্ভুল, আরও টেকসই। আর সেই ভবিষ্যতের কৃষি গড়ে তুলতে হলে এখন থেকেই চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তিকে কৃষিক্ষেত্রে গ্রহণ করতে হবে। ২০১৮ সালে চীনের শিনশিং কাউন্টির একটি গ্রামে কৃষকের খোঁজ করছিলাম। মাঠের পর মাঠ ফসল ফলে আছে। কিন্তু কৃষকের দেখা নেই। একটা মাঠে দেখলাম বিশাল এক ট্রাক্টর জমি চাষ করছে। ভাবলাম, যাহোক অবশেষে পাওয়া গেল কৃষকের সন্ধান। কিন্তু একটু এগিয়ে গিয়ে দেখি সেই ট্রাক্টরে কোনো চালক নেই। বুঝতে পারলাম দূর থেকে রিমোটে বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হচ্ছে এই যন্ত্র। কৃষিযন্ত্র উৎপাদনে চীন এগিয়েছে বহু পথ। প্রতি বছর চীনে অনুষ্ঠিত পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ কৃষিযন্ত্রের প্রদর্শনী জানান দেয়, গোটা পৃথিবী প্রতিনিয়ত প্রস্তুত হচ্ছে কৃষি তথা খাদ্য উৎপাদনের যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়। পৃথিবীতে এযাবৎকালে যন্ত্র চলেছে মানুষের স্বয়ং উপস্থিতি ও পরিচালনায়। আজকের দিনে যন্ত্রকে দেওয়া হচ্ছে নিজে চালিত হওয়ার শক্তি। সেটিই বিজ্ঞানের আধুনিকতম উৎকর্ষ।
২০১৯ সালে চীনের শ্যাংডং প্রদেশের চিনদাওয়ে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কৃষি যন্ত্রপাতি মেলায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেখানে বিভিন্ন সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামে আগামী দিনের কৃষিযন্ত্র নিয়ে পৃথিবীর কৃষি প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীদের চিন্তাভাবনা ও গবেষণাও উঠে আসে। কৃষিযন্ত্রের মাঠ প্রদর্শনীতে গিয়ে দেখেছি চীনের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলো এখন ইউরোপের পাশাপাশি এশিয়ার দেশগুলোকে মাথায় রেখে স্বয়ংক্রিয় সব কৃষিযন্ত্র উন্নয়ন করছে। সে ভ্রমণে চীনের কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরির বৃহৎ প্রতিষ্ঠান লোভোলের হেডকোয়ার্টার এবং যন্ত্রপাতি তৈরির কারখানা ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছিল। লোভোল হচ্ছে কৃষি, নির্মাণ ও অবকাঠামো যন্ত্রাংশ ছাড়াও ভারী ও বৃহৎ যানবাহন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে চীনের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান। এটি উচ্চতর প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হিসেবেও চালকের আসনে। ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই লোভোল কোম্পানির কর্মীর সংখ্যা ১৬ হাজারের বেশি। লোভোল ১২০টি দেশে তাদের আধুনিকতম কৃষিযন্ত্র সরবরাহ করছে।
তখন অক্টোবরের শেষ দিক। এক রৌদ্রোজ্জ্বল সকালে চিংদাও শহর থেকে রওনা করলাম। প্রায় দুই শ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে উয়েফাং শহরের উপকণ্ঠে এক বিস্তীর্ণ খেতে দেখলাম অসাধারণ দক্ষতায় চলছে সব কৃষিযন্ত্র। সব যন্ত্রই চালকবিহীন। বিস্ময়কর এক প্রদর্শনী। কী নেই! দানবাকার বিশাল ট্রাক্টর থেকে রোবটাকৃতির কীটনাশক ছিটানোর যন্ত্র, স্বয়ংক্রিয় ড্রোন। সেখানেই কথা হলো লোভোল হেভি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার (ওভারসিজ) সানডেমিং-এর সঙ্গে। তিনি জানালেন, চীনের বিশাল কৃষিখামারগুলোর জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের চাহিদা বাড়ছে। শুধু চীনেই নয়, তাদের বাজার এখন পৃথিবীজুড়ে। আমার জিজ্ঞাসা ছিল, বাংলাদেশের মতো দেশের যেখানে খণ্ড খণ্ড ভূমি রয়েছে, সেখানে এত বিশাল আকারের কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ নেই, এ নিয়ে তাদের কোনো বিকল্প চিন্তা আছে কিনা? এ প্রশ্নের জবাবে খুব কৌশলী ছিলেন সানডেমিং। তিনি বলেন, ‘আপাতত আমরা ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য কৃষিযন্ত্র তৈরির কথা ভাবছি না। চীনের অন্য কোম্পানিগুলো ছোট যন্ত্র তৈরি করছে। তবে বাজারে বড় চাহিদা তৈরি হলে আমরা নিশ্চয়ই ক্ষুদ্র যন্ত্রপাতি তৈরিতেও লেগে যাব।’ বোঝা গেল লোভোল কোম্পানি কৃষিশিল্পের যন্ত্রপাতির বাজারটা নিয়েই আগ্রহী। কারণ আগামীর কৃষি যে শিল্পের কৃষি, সে সত্য তারা বেশ ভালোভাবেই বুঝেশুনে নিয়েছেন।
যাহোক লোভোল কোম্পানির যন্ত্র নির্মাণের বিশাল সব কারখানার কিছু অংশের কাজকর্মও দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। কোথাও তৈরি হচ্ছে যন্ত্রাংশ, কোথাও চলছে অ্যাসেম্বলিং। বিরাট কর্মযজ্ঞ।
বিশ্বব্যাপীই কৃষির যান্ত্রিকীকরণ নিয়ে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে পৃথিবী। কার চেয়ে কে কতটা উৎকর্ষ সাধন করতে পারে চলছে সেই প্রতিযোগিতা। আসা যাক বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। আমাদের কৃষি যান্ত্রিকীকরণে বড় সাফল্যটি হিসাব করা হয় জমি কর্ষণে। পৃথিবীর প্রাচীনতম আবিষ্কার ভূমি কর্ষণের ক্ষেত্রে এখন থেকে শত বছর আগে এই ভূমিতে যে ট্রাক্টর এসেছিল, সেই জায়গাতে আমরা শতভাগের কাছাকাছি ব্যবহার পূর্ণ করতে পেরেছি ধরে নেওয়া হয়। যদিও দুর্গম এমন অঞ্চলও রয়েছে যেখানে এখনো ট্রাক্টর পৌঁছেনি। দেশের কৃষি যান্ত্রিকীকরণের চিত্র হলো জমি চাষে ৯৫ ভাগ, সেচব্যবস্থায় ৯৫, ফসল তোলা বা হারভেস্টে ১ দশমিক ৫, ধান মাড়াইয়ে ৯৫, রোপণে দশমিক ৫ ভাগেরও কম। মূল সংকটের জায়গাটি এখানেই। ফসল উৎপাদন-পূর্ববর্তী যান্ত্রিকীকরণে যে অগ্রগতি অর্জন করেছি, উৎপাদন ও তার পরবর্তী প্রক্রিয়াকরণে পিছিয়ে থাকায় আমাদের বিপুল পরিমাণ ফসলের ক্ষতি হচ্ছে।
এখন গোটা পৃথিবীই প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। তার সঙ্গে আমাদের দেশেও শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসছেন কৃষিতে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো কিছুটা পথ হাঁটলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন কিংবা স্মার্টকৃষির পথে আমাদের কোনোরকম অগ্রগতি নেই। নেই তেমন কোনো গবেষণা কিংবা প্রচেষ্টা। ফলে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কৃষিতে নিজস্ব অংশগ্রহণের প্রশ্নে আমাদের অবস্থান অনেক দূরে।
পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো আধুনিক প্রযুক্তিকে দ্রুত কাজে লাগাচ্ছে বাণিজ্যিক স্বার্থে। এর জন্য সুদূরপ্রসারী গবেষণা, মাঠপর্যায়ে পর্যবেক্ষণসহ যাবতীয় পরীক্ষানিরীক্ষা চালাচ্ছে। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশসহ গোটা দক্ষিণ এশিয়ার কৃষি পরিস্থিতি মাথায় রেখে প্রস্তুত হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রস্তুত হচ্ছে চীন। এখানে সব মিলিয়ে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিযন্ত্রের বিশাল বাণিজ্যিক ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। আমরা কৃষি যন্ত্রকৌশল ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষে এগিয়ে না যেতে পারলে শুধু ক্রেতা হিসেবেই আধুনিক প্রযুক্তির সুফল ভোগ করতে হবে। প্রযুক্তিগত জ্ঞানবিজ্ঞান অর্জনের প্রশ্নে সবার সমান অধিকার রয়েছে। এই অধিকার নিয়ে আমাদেরও শামিল হওয়া দরকার অত্যাধুনিক স্মার্টকৃষির মিশনে।


