অবশেষে বরিশাল মহানগরীর সুপেয় পানি সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়নে ‘ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট’ চালু করল নগর প্রশাসন।

বুধবার (৩০ এপ্রিল) নগরীর দপদপিয়া এলাকায় কীর্তনখোলা নদীতীরের এ ট্রিটমেন্ট প্লান্টটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন নগর প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস জাহান শিরিন। এসময় সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল বারী, প্রধান প্রকৌশলী হুমায়ুন কবির ও পানি শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী ওমর ফারুকও উপস্থিত ছিলেন।

প্রায় ৬০ বর্গ কিলোমিটারের বরিশাল মহানগরীর প্রায় ৫৫ হাজার হোল্ডিং-এর ৩৫ হাজারের মত পানির সংযোগ বিদ্যমান থাকলেও সাড়ে ৭ কোটি লিটার চাহিদার ৬০ ভাগও সরবরাহ করতে পারছে না সিটি করপোরেশন। ৩৮টি গভীর নলকূপ থেকে পাম্প হাউজের মাধ্যমে ৭টি ওভারহেড ট্যাংক সহ সরাসরি বিভিন্ন ব্যাসার্ধের প্রায় আড়াইশ কিলোমিটার পাইপ লাইনের মাধ্যমে গ্রাহকদের পানি সরবরাহের কথা নগর ভবনের।

কিন্তু ১৯৯৫ সালের পরে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়নে কোনো প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন না হওয়ায় এ মহানগরীর পানি সরবরাহ ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক পর্যায়ে থাকার মধ্যেই এ কমিটমেন্ট প্লান্টটি চালু হল। ফলে নগরীর পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রতিদিন বাড়তি ১ কোটি ৪০ লাখ লিটার পানির যোগান মিলবে।

আপাতত ট্রিটমেন্ট প্লান্টটি থেকে নগরীর আমতলা মোড়, জেলা স্কুল ও মহিলা কলেজ ওভারহেড ট্যাঙ্কে পানি উত্তোলন করে তা গ্রাহকদের মাঝে সরবরাহ করা হবে।

১৯৯২ থেকে ’৯৫ সালের মধ্যে এসীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে ৫টি ওভারহেড ট্যাংক এবং ৫০ কিলোমিটার নতুন পাইপ লাইন নির্মাণের পরে এনগার পানি সরবরাহ নিয়ে কোনো বাস্তব অগ্রগতি হয়নি।

এমনকি, সরকারি অর্থায়নে ২০০৩ সালে দুটি ওয়াটার ট্রিটমেন্টে প্লান্ট ও সংযুক্ত ডেলিভারি পাইপ লাইন নির্মাণের প্রকল্প প্রস্তাবনা দাখিলের পরে তা নীতিগতভাবে অনুমোদন হলেও ১/১১ সরকার আমলে প্রকল্পটি আর আলোর মুখ দেখেনি। তবে ২০১১-১২ অর্থ বছরে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা ব্যায়ে প্রকল্পটির কাজ শুরু হলেও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর দীর্ঘ কালক্ষেপণ করে ২০২০ সালের দিকে তা বাস্তবায়ন করে। তবে তৎকালীন নগর প্রশাসন প্রকল্পটি বুঝে নেয়া হয়নি। এমনকি সাবেক মেয়র সেরনিয়াবাদ সাদিক আবদুল্লাহর সময় প্রকল্পটির কাজ সম্পন্ন হবার পরেও তা পরিত্যক্ত অবস্থাই পড়েছিল।

ইতোমধ্যে নদী ভাঙনে বেলতলা প্লান্টটি কীর্তনখোলা ভাঙনের মুখে পরে। পরে পানি উন্নয়ন বোর্ড বিপুল অর্থ ব্যায়ে সেখানে নদী তীর রক্ষা কাজও সম্পন্ন করে।

তবে নগরী যুড়ে পানির ব্যাপক হাহাকারের মধ্যেও দুটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লন্ট চালু করা হয়নি। এ বছরের শুরুর দিকে সাবেক নগর প্রশাসক ট্রিটমেন্ট প্লান্ট দুটি নিয়ে একটি সম্ভব্যতা সমিক্ষা শেষে তা চালুর সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যায়ে নগরীর দপদপিয়া ও বেলতলা এলাকায় কির্তনখোলা নদী তীরের ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লাট দুটি চালুর লক্ষ্যে কাজ শুরুর পরে গত মাসখানেক ধরে দপদপিয়ার প্লান্টটি পরিক্ষামূলকভাবে চালু করাহয়। বুধবার তা আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করলেন নগর প্রশাসক। আগামী মাস তিনেকে মধ্যে বেলতলা ট্রিটমেন্ট প্লান্টটিও চালু করা হবে বলে সিটি করপোরেশনের পানি শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী ওমর ফারুক জানিয়েছেন।

দুটি ট্রিটমেন্ট প্লান্ট চালু হলে বরিশাল মহানগরীতে বাড়তি প্রায় পৌনে ৩ কোটি লিটার পানি যুক্ত হবে বলে জানা গেছে । প্লন্ট দুটি থেকে ওভারহেড ট্যাঙ্ক ও সরাসরি বিতরন লাইনে পানি সরবারহ শুরুর পরে বেশ কয়েকটি পাম্প হাউস ও সংযুক্ত গভীর নলকুপ বন্ধ করে দেয়া হবে বলেও জানা গেছে। এতেকরে অত্যাধিক ভ’গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে বরিশাল মহানগরীতে যে পরিবেশগত সমস্যা সষ্টি হচ্ছিল, তা অনেকটাই এড়ান সম্ভব হবে বলেও মনে করছে নগর প্রশাসন।

বরিশাল নগরবাসীর সেবা দেওয়ার প্রধান কেন্দ্র সিটি কর্পোরেশনের (বিসিসি) জরাজীর্ণ ভবন এখন নিজেই ‘অসুস্থ’। আশির দশকে নির্মিত এই পুরাতন ভবন বাইরে থেকে চকচকে দেখালেও ভেতরে দেয়ালে দেয়ালে এখন ফাটল আর ছাদ থেকে পলেস্তরা খসে পড়া নিত্যদিনের ঘটনা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজ চালিয়ে গেলেও যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আতঙ্কে দিন কাটছে সবার।

অনুসন্ধানে জানা যায়, পৌরসভা থাকাকালে ১৯৮৫ সালে ৪৬ শতাংশ জমির ওপর ৩৫ কক্ষের এই দোতলা ভবনের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ১৯৯০ সালে উদ্বোধন করা হয় এই ভবন। পরে ২০০২ সালে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত হয় বরিশাল পৌরসভা।

সিটি কর্পোরেশন হওয়ার পর ক্রমবর্ধমান সেবার চাপ সামলাতে কোনো অনুমোদিত নকশা ছাড়াই দোতলা পৌর ভবনটি তিন তলা করা হয়। এতে সৃষ্টি হয় ভবনের ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত চাপ। গত পাঁচ বছর ধরে ভবনের বিম ও মেইন কলামগুলোতে ভয়াবহ ফাটল দেখা দিয়েছে, যা বর্তমানে বিপজ্জনক রূপ ধারণ করেছে।

বিসিসির স্থপতি সাইদুর রহমান জানান, ভবনটি মূলত দোতলা করার উপযোগী ছিল। নকশা বহির্ভূতভাবে তিন তলা করায় এটি এখন ‘ওভারলোডেড’। যেকোনো মৃদু ভূমিকম্পেই ভবনটি ধসে পড়ার বড় হুমকি রয়েছে। ঝুঁকি এড়াতে দ্রুত এই ভবন ত্যাগ করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

বর্তমানে ৩৫ কক্ষের পরিবর্তে এখানে ৭০টি কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। দেড় হাজারেরও বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৪ হাজার মানুষের যাতায়াত এই জরাজীর্ণ ভবনে।

ভবনটির দুরবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল বাসার। তিনি জানান, মেইন কলামগুলোর ফাটল এতটাই ভয়াবহ যে এটি এখন আক্ষরিক অর্থেই মরণফাঁদ। অতি সম্প্রতি ভূমিকম্প এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় ভবনের একটি অংশে অগ্নিসংযোগের ফলে এর কাঠামো আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে অন্য বিভাগের জনবলও এই ভবনে গাদাগাদি করে বসায় পরিস্থিতি শ্বাসরুদ্ধকর হয়ে উঠেছে।

সেবা নিতে আসা নগরবাসী ও ঠিকাদাররা জানান, ভবনে ঢুকলেই তারা আতঙ্কে থাকেন। সেবা প্রত্যাশী লিটন আকন বলেন, ভবনের যে অবস্থা তাতে সংস্কার ছাড়া এখানে যাতায়াত করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

বিসিসির প্রধান প্রকৌশলী হুমায়ুন কবীরও স্বীকার করেন, জীবন বাঁচাতে একটি নতুন নগর ভবন এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

বিসিসি’র প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বলেন, বর্তমানে সবার জীবনই এখানে ঝুঁকিপূর্ণ। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় উদ্যোগ নিয়েছে সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ। নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় প্রায় ৬ একর জায়গার ওপর নতুন ১৫ তলা নগর ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। নতুন ভবনের নকশা ও প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। শিগগিরই এ পরিকল্পনা পাস হবে বলে আশা করছেন প্রশাসক।

বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের সেবা নিশ্চিত করতে এই জরাজীর্ণ ভবনের বিকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন মনে করেন নগরবাসী।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০ এপ্রিল থেকে শিক্ষকদের পদোন্নতির দাবিকে কেন্দ্র করে চলা ১০ দিনের আন্দোলনের অবসান হতে যাচ্ছে। আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের পথ তৈরি হওয়ায় শিগগিরই ক্লাস-পরীক্ষা কার্যক্রম শুরু হচ্ছে।

বরিশালের বিভাগীয় কমিশনারসহ একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং শিক্ষক প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন অনুষদের ডিনদের অংশগ্রহণে ৩০ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার) অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে শিক্ষকদের ক্লাস-পরীক্ষায় ফেরার বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয় এবং পদোন্নতিসংক্রান্ত জটিলতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়।

আন্দোলনরত শিক্ষকদের সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই বছর ধরে তারা পদোন্নতির দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। এর ধারাবাহিকতায় ১৯ এপ্রিল মৃত্তিকা ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জামাল উদ্দিন আমরণ অনশন শুরু করেন। ২৩ ঘণ্টা অনশনের পর অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি অনশন ভাঙেন। তবে আন্দোলন থেমে থাকেনি।

২০ এপ্রিল থেকে কর্মবিরতি ও শাটডাউন কর্মসূচি শুরু হয়, যার ফলে বন্ধ হয়ে যায় ক্লাস-পরীক্ষা। পরে ২৮ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলনে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে পড়ে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির হয়ে যায়।
চলমান সংকট নিরসনে বরিশালের বিভাগীয় কমিশনারসহ একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিজ উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে উপাচার্যের কক্ষে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে শিক্ষক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয় এবং একাডেমিক কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে অনুরোধ জানানো হয়।

আন্দোলনরত শিক্ষক ও প্রকৌশল অনুষদের ডিন সহযোগী অধ্যাপক রাহাত হোসেন ফয়সাল বলেন, বিভাগীয় কমিশনার ও উপাচার্যের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তাদের দাবির বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির আশ্বাস পাওয়া গেছে। দ্রুত পদোন্নতি প্রক্রিয়া শুরু করা হবে এবং পরবর্তীতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, আমরা ক্লাসে ফিরে যেতে আগ্রহী। তবে এ বিষয়ে সাধারণ শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. তৌফিক আলম বলেন, ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে বন্ধ থাকা ক্লাস ও পরীক্ষা দ্রুত শুরু করা হবে।

একই সঙ্গে শিক্ষকদের সমস্যাগুলো সমাধানে আগামী সিন্ডিকেট সভায় বিস্তারিত আলোচনা করা হবে এবং সেখান থেকে সমাধান আসবে।
বৈঠক শেষে বিভাগীয় কমিশনার সাংবাদিকদের জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। শিক্ষকদের দাবি-দাওয়া যৌক্তিকভাবে সিন্ডিকেটে আলোচনা করা হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালার আলোকে সমাধান করা হবে। প্রয়োজনে বিষয়টি ইউজিসিতে পাঠানো হবে।

দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার পর এ সমঝোতায় স্বস্তি ফিরেছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। তারা আশা করছেন, দ্রুত সংকটের স্থায়ী সমাধান হলে একাডেমিক কার্যক্রম স্বাভাবিক হবে এবং ক্লাস-পরীক্ষা বাতিল হওয়ায় সেশনজটের যে আশঙ্কা ছিল তা কমে আসবে।