TT Ads

ঈদ যাত্রা স্বস্তির ও আনন্দদায়ক করার জন্য সরকারের চেষ্টার পরও এবার মহাসড়কের যানজট চরম ভোগান্তিতে ফেলতে পারে ঈদে ঘরমুখী মানুষ। ঢাকা-ময়মনসিংহ ও দর ঢাকা-টাঙ্গাইল দুটি মহাসড়কে উন্নয়নকাজ, অব্যবস্থাপনা

ঈদ যাত্রা স্বস্তির ও আনন্দদায়ক করার জন্য সরকারের চেষ্টার পরও এবার মহাসড়কের যানজট চরম ভোগান্তিতে ফেলতে পারে ঈদে ঘরমুখী মানুষ। ঢাকা-ময়মনসিংহ ও দর ঢাকা-টাঙ্গাইল দুটি মহাসড়কে উন্নয়নকাজ, অব্যবস্থাপনা, ঢাকার প্রবেশপথে সড়ক দখল, মহাসড়কের পাশে বাজার ও যানবাহনের অবৈধ স্ট্যান্ড, সেতুর টোলপ্লাজায় ধীরগতির কারণে দুর্ভোগের আশঙ্কা রয়েছে ঈদযাত্রায়। বিশেষ করে ঈদের আগের দুই দিন যানবাহনের চাপ বেড়ে গেলে যানজট ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে শঙ্কা আছে। এছাড়া ঢাকা-চট্রগ্রাম ও ঢাকা সিলেট মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে যানজটও মানুষকে ভোগাতে পারে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তা, যাত্রী ও যানবাহন চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবার ঈদযাত্রায় গাজীপুরের অন্তত আট স্থানে যানজট ভোগান্তির কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক দিয়ে চান্দনা চৌরাস্তা হয়ে ময়মনসিংহ জেলার ওপর দিয়ে পাঁচটি জেলা এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক দিয়ে কালিয়াকৈর হয়ে উত্তরবঙ্গের ১৬টি জেলার যানবাহন চলাচল করে। এই দুই মহাসড়কে মাঝেমধ্যে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে সৃষ্টি হয় যানজট। ঈদে যানবাহনের চাপ বাড়লে যাত্রীদের পোহাতে হবে ভোগান্তি। সড়ক দখল, যানবাহনের অবৈধ স্ট্যান্ড, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করানোর কারণে মহাসড়ক দিয়ে চলাচল করা যানবাহনের চালক ও যাত্রীরা ভোগান্তির আশঙ্কা করছেন।

ভোগান্তির শিকার হওয়ার আটটি স্থানের মধ্যে রয়েছে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ছয়টি এবং ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের দুটি। দুই মহাসড়কের একাধিক স্থানে ভাসমান বাজার, ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল, অবৈধ স্থাপনা, যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্কিং ও মহাসড়কের যত্রতত্র যাত্রী ওঠানো-নামানোর কারণে ঈদযাত্রায় ভোগান্তির শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে কয়েক ঘণ্টা দুর্ভোগ পোহাতে হতে পারে ঘরমুখো যাত্রীদের।

জানা গেছে, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক দিয়ে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬টি জেলার যানবাহন চলাচল করে। প্রতি বছর ঈদযাত্রায় যানবাহনের চাপ বেড়ে যায় এই মহাসড়কে। কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা ত্রিমোড়ে যানজট সৃষ্টি হয়। মহাসড়কের নানা স্থানে দুই পাশেই অবৈধ দখলদারদের কারণে সড়ক সংকুচিত হয়ে গেছে। গাজীপুর অঞ্চলে পোশাক কারখানা ছুটি হলে চাপ পড়ে মহাসড়কে। ফলে ব্যবস্থাপনার ঘাটতি হলে যেকোনো সময় যানজট দেখা দিতে পারে।

যাত্রী ও যানবাহনচালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী স্টেশন রোড, কলেজ গেট, বোর্ড বাজার, চান্দনা চৌরাস্তা, সদর উপজেলার ভবানীপুর, বাঘের বাজার, শ্রীপুর উপজেলার গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ি, মাওনা চৌরাস্তা, এমসি বাজার, নয়নপুর ও জৈনাবাজারে যানজটের শঙ্কা আছে। এ ছাড়া চান্দনা চৌরাস্তার ফ্লাইওভার খুলে না দেওয়ায় এবারও চান্দনা চৌরাস্তায় ভোগান্তি সৃষ্টি হতে পারে। ইতোমধ্যে যানজটের এসব স্থান চিহ্নিত করেছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংস্থাগুলো। গাজীপুরের অন্তত আট স্থানে যানজট ভোগান্তির কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে

জানা গেছে, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে চলমান বাস রর্‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের কাজ এক যুগের বেশি সময়েও শেষ না হওয়ায় ভোগান্তি পোহাতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে বিআরটি প্রকল্পের কাজ চলায় জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে পরিবহনচালক ও যাত্রীদের।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গাজীপুর থেকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত নির্দিষ্ট লেনে দ্রুত, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটি হাতে নেয় সরকার। ২০ দশমিক ৫ কিলোমিটার সড়কে বিআরটি প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় চার বছর এক মাস। এই প্রকল্পের সময়সীমা পাঁচ দফা বাড়ানো হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনও তা করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা ত্রিমোড় হয়ে উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলার যানবাহন চলাচল করে। ঈদযাত্রায় এই মহাসড়কের কোনাবাড়ী, সফিপুরসহ বিভিন্ন স্থানে দেখা যায় গাড়ির দীর্ঘ সারি। বিশেষ করে নবীনগর চন্দ্রা মহাসড়কে গাড়ির চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ঢল নামে। সাত কিলোমিটার সড়কের গাজীপুর মহানগরীর জিরানী বাসস্ট্যান্ডে যানজট লেগেই থাকে সবসময়।

যানজটের কারণ হিসেবে চালকরা বলছেন, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বেশিরভাগ অংশ ভাঙাচোরা। স্বাভাবিক সময়ে এই সড়ক পার হতে দুই ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যায়। চন্দ্রার যানজট মহাসড়কের কয়েক কিলোমিটারে ছড়িয়ে পড়ে। এতে প্রতি বছর ঈদযাত্রায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভোগান্তিতে পড়েন ঘরমুখো মানুষ।

জামালপুরের ভাটিবাংলা পরিবহনের চালক তুহিন শেখ বলেন, ‘টঙ্গী থেকে বোর্ড বাজার পর্যন্ত বিআরটি প্রকল্পের কাজ এখনও শেষ হয়নি। ঈদে মানুষের ঢল ও গাড়ির চাপ বাড়লে প্রকল্পের স্টেশনগুলোতে রাস্তা সরু থাকায় যানজট সৃষ্টি হতে পারে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকা লাগবে।’

একই আশঙ্কার কথা বললেন শ্রীপুরের প্রভাতী-বনশ্রী পরিবহনের চালক রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘চান্দনা চৌরাস্তায় মহাসড়কের পাশে ময়লার ভাগাড় বানানো হয়েছে। এতে রাস্তা সরু হয়ে গেছে। স্বাভাবিক সময়েই এখানে যানজট লেগে থাকে। ঈদযাত্রায় যানবাহনের চাপ বাড়লে যানজট আরও প্রকট হবে।’

ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়ার আলম এশিয়া পরিবহনের যাত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, ‘মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ফুটপাত ও সড়ক দখল করে বাজার বসানো হয়েছে। সঠিক তদারকি না থাকায় অটোরিকশার বেপরোয়া চলাচল বাড়ছে। অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে যানজটে ঈদযাত্রায় এই মহাসড়কে ঘরমুখো মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে। কারণ এখনই কয়েক ঘণ্টা যানজটে বসে থাকতে হয় যাত্রীদের।’

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ সূত্র বলছেন, ‘ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে সবচেয়ে দীর্ঘ যানজট হয় চান্দনা চৌরাস্তা ও ভোগড়ার পেয়ারাবাগান এলাকায়। ঈদের আগেই চান্দনা চৌরাস্তার ঢাকামুখী উড়ালসড়ক খুলে দেওয়া হবে। এতে ময়মনসিংহ থেকে আসা ঢাকামুখী যানবাহনগুলোকে যানজটে পড়তে হবে না। এ ছাড়া ঈদের আগেই মহাসড়কের অবৈধ স্থাপনা, বাজার ও ফুটপাত দখলমুক্ত করা হবে। তখন গাড়ি বাড়লেও যানজট হবে না।’

এদিকে পবিত্র ঈদুল ফিতরে ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রা নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও নির্বিঘ্ন করতে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)। এ সংক্রান্ত জরুরি সভা সম্প্রতি ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আব্দুস সালামের সভাপতিত্বে নগর ভবনে অনুষ্ঠিত হয়।

সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যাত্রীদের ভোগান্তি নিরসন এবং যানজটমুক্ত সড়ক নিশ্চিত করতে ডিএসসিসির পক্ষ থেকে টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন, অবৈধ কাউন্টার উচ্ছেদ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিশেষ পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। অবৈধ কাউন্টার ও দোকান উচ্ছেদ ,নিয়মতান্ত্রিক কাউন্টার বরাদ্দ, টার্মিনাল ও বাস ব্যবহার নিশ্চিতকরণ ।

ঈদযাত্রায় এবারও সেই চিরচেনা যানজটে ভোগান্তির শঙ্কা রয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে শিমরাইল, কাঁচপুর, সোনারগাঁসহ সারা দেশে দেড় শতাধিক স্পটে যানজটে দীর্ঘ ভোগান্তির শঙ্কা রয়েছে।

সওজের তথ্যমতে, সড়ক-মহাসড়কের ৭৫ শতাংশের অবস্থা ভালো। কিন্তু ঢাকা ছাড়তেই ভোগান্তি হতে পারে গাবতলী, সায়েদাবাদ, টঙ্গী ও হানিফ ফ্লাইওভারে। ঢাকার প্রবেশপথে হাজার হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইকের ভিড়। এতে বাসের গতি আটকে যাচ্ছে। জানা গেছে, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক এবং আশুগঞ্জ-সরাইল-ব্রাহ্মণবাড়িয়া-আখাউড়া মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণের কাজ চলমান থাকায় নরসিংদী ও আশুগঞ্জ এলাকায় দুর্ভোগে পড়তে হবে সিলেটের যাত্রীদের। এখনই দুর্ভোগ হচ্ছে এই দুই সড়কে।

হাইওয়ে পুলিশ এবং সওজ যদিও বলছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজটের শঙ্কা কম। কিন্তু ভোগাতে পারে সায়েদাবাদ এবং কাঁচপুরের যানজট। নারায়ণগঞ্জে মহাসড়কের দুই পাশে কলকারখানা এবং ঘনবসতির কারণে কাঁচপুর থেকে মেঘনা পর্যন্ত যানজট কিংবা গাড়ির গতি ধীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্যাটারিচালিত রিকশার দৌরাত্ম্য এবং মেঘনা ও গোমতীর টোলপ্লাজায় যানজটের শঙ্কা রয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ছয়টি স্থানে ভোগান্তির শঙ্কা রয়েছে। গজারিয়া অংশের ১৩ কিলোমিটারের মধ্যে ভবেরচর স্ট্যান্ডে বিশৃঙ্খলার কারণে প্রতিদিন দীর্ঘ যানজট হচ্ছে।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভুলতা থেকে রূপসী হয়ে বরপা বিশ্বরোড পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সড়কে প্রতিদিন গভীর রাত পর্যন্ত যানজট হচ্ছে, যা ঈদে বাড়তে পারে। এই যানজটের কারণ ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নির্মাণকাজ। ভুলতা থেকে বরপা বিশ্বরোড পর্যন্ত যানজট নিরসনে সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অবৈধ দখল ও পার্কিং উচ্ছেদ করা হচ্ছে।

যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, নির্বাচনের সময় যে পরিমাণ যাত্রী ঢাকা ছেড়েছিল, ঈদে এর কয়েক গুণ যাত্রী হবে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা পরিবহন খাত ও সড়কের নেই। তাই ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে। সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অবৈধ যানবাহনের কারণে যানজট হয়। এগুলো ঈদের সময় বন্ধ রাখতে হবে। সড়কগুলোর মোড়ে বাজার এবং অটোরিকশার স্ট্যান্ড তৈরি হয়েছে। এ কারণে দূরপাল্লার গাড়ি আটকে যায়। এগুলো দূর করতে হবে।

আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে নৌপথে যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাত্রা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন নৌ, রেল ও সেতু এবং সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম রবি। তিনি বলেন, ঈদে ভাড়া বাড়ানো হবে না। তিনি বলেন, নৌপথে ঈদে যাত্রা নিরাপদ করতে ২৬টির মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এবারের ঈদযাত্রা নিরাপদ হবে।

TT Ads

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *