TT Ads

দ্যা ডেইলি বাংলা নিউজ অনলাইন

আসন্ন ঈদের আগে পরে রাজধানীসহ সারা দেশের সাথে বরিশাল অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগের মূল সেতুবন্ধন বরিশাল-ফরিদপুর-ঢাকা ৮ নম্বর জাতীয় মহাসড়কের ফরিদপুর-বরিশাল অংশের অপ্রশস্ত মহাসড়কে দুর্ভোগের সাথে দুর্ঘটনাও ক্রমশ বাড়ছে। মার্চের প্রথম দুই সপ্তাহে বরিশাল-ভাঙ্গা মহাসড়কের ৯১ কিলোমিটারে ছোট-বড় অন্তত ৫০টি দুর্ঘটনায় ইতোমধ্যে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরো অর্ধশতাধিক। পদ্মা সেতু চালু হবার পরে এ মহাসড়কে যানবাহন চলাচল তিনগুনেরও বেশি বৃদ্ধি পেলেও মহাসড়কটি ৬ লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পটি একের পর এক জটিলতা ও অনিশ্চয়তার কবলে। অর্থ বরাদ্দ সত্ত্বে¡ও কয়েক দফা সময় বৃদ্ধি করেও এ মহাসড়কটি ৬ লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ কাজটিও গত ৮ বছরেও শেষ হয়নি।

এমনকি ৮ বছর ধরে পদ্মা সেতু ও ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে নির্মিত হলেও সেখান থেকে সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের সংযুক্ত একমাত্র মহাসড়কটি উন্নয়নে যথাযথ কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি বিগত দুটি সরকার। বিষয়টি নিয়ে বরিশাল বিভাগ উন্নয়ন ও স্বার্থ সংরক্ষণ পরিষদ ক্ষোভ প্রকাশ করে অবিলম্বে এ লক্ষ্যে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

তবে ইতোমধ্যে শুধু ভূমি অধিগ্রহণ খাতে ব্যয় প্রায় ৩ গুন বৃদ্ধির প্রস্তাবনা বিগত অন্তর্বর্তী সরকার বাতিল করে পূর্বের বরাদ্দকৃত অর্থে প্রকল্পটি ফরিদপুর থেকে বরিশাল পর্যন্ত সীমিত করে পায়রা বন্দর-কুয়াকাটা অংশকে বাদ দিয়ে গেছে। এমনকি প্রকল্পটি থেকে বরিশাল বাইপাস পর্যন্ত বাদ দেয়ায় মহানগরীর মধ্যভাগ দিয়ে ৬ লেন মহাসড়ক বরিশালের শেষ সীমা লেবুখালীতে পায়রা সেতুতে নিয়ে যাবার কথা বলা হয়েছে। ফরে আগামীতে বরিশাল মহানগরীও যানজটে অবরুদ্ধ হবার বিষয়টি পাকাপোক্ত হতে চলেছে।

তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বরিশাল-ফরিদপুর ৬ লেন প্রকল্পটিরও ন্যূনতম কোনো অগ্রগতি নেই। অথচ মহাসড়কটির ওপরই সারা দেশের সাথে দক্ষিণাঞ্চলের ১১টি জেলার সড়ক পরিবহন নির্ভরশীল। এমনকি প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘পদ্মা সেতু ও সংযুক্ত এক্সপ্রেসওয়ে’র পূর্ণ সুফলও নির্ভর করছে ফরিদপুর-বরিশাল-পায়রা-কুয়াকাটা জাতীয় মহাসড়কটির উন্নয়নের ওপর।

অথচ ২০২২-এর জুনে পদ্মা সেতু চালু হবার পরে বরিশাল অঞ্চলের জাতীয় এ মহাসড়কটি ও আঞ্চলিক মহাসড়কগুলোতে যানবাহনের কয়েকগুন বাড়তি চাপ ইতোমধ্যে দুর্ঘটনার সংখ্যা বৃদ্ধিসহ নানা বিড়ম্বনার সৃষ্টি করছে। এমনকি বাড়তি যানবাহনের কারণে এ মহাসড়কের ভাঙ্গা থেকে বরিশাল পর্যন্ত ৯১ কিলোমিটার মহাসড়কে যানবাহনের গতি এখন অনেক ধীর। ঢাকা থেকে ৬৫ কিলোমিটার পশ্চিমে ভাঙ্গায় পৌঁছতে যেখানে মাত্র ৫০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা সময় লাগছে, সেখানে ৯১ কিলোমিটার বরিশালে পৌঁছতে সময় লাগছে প্রায় ৩ ঘণ্টা। ফলে আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে ভাঙ্গা থেকে বরিশাল পর্যন্ত ব্যাপক যানজটে ঘরমুখী মানুষের বিড়ম্বনা ও দুর্ভোগ ইতোমধ্যে বর্ণনার বেড়ে গেছে। ১৭ মার্চ থেকে সরকারি ছুটি শুরু হলে পরিস্থিতি কতটা ভীঅবহ আকার ধারণ করবে, তা নিয়ে শংকিত পুলিশ প্রশাসনও।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় ২০১৫ থেকে ’১৮ সালে ২১১ কিলোমিটার দীর্ঘ বরিশাল-ফরিদপুর ও বরিশাল-পায়রা-কুয়াকাটা জাতীয় মহাড়কটি ৬ লেনে উন্নীতকরণের লক্ষ্যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষাসহ পথ নকশা প্রনয়ণ করা হয়।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সুপারিশ ও সমীক্ষার পথনকশা অনুযায়ী প্রায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণে ১৮শ’ ৫৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি আলাদা প্রকল্প অনুমোদন করে একনেক। ২০২১-এর জুনের মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণের কাজটি শেষ করার কথা থাকলেও ২০২৪-এর জুনে চাহিদার অর্ধেক ভূমিও অধিগ্রহণ সম্পন্ন না হয়ায় বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রকল্প ব্যয় প্রায় ৬ হাজার কোটিতে উন্নীত করে নতুন ডিপিপি নাকচ করে মূল বরাদ্দে প্রকল্পটি ফরিদপুর থেকে বরিশাল পর্যন্ত সীমিত করাসহ জুন-২৬’র মধ্যে তা শেষ করতে নির্দেশনা দেয়া হয়। সে লক্ষ্যে ভূমি অধিগ্রহণ কাজ প্রায় ৮০ ভাগ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হলেও ফরিদপুর অংশে একটি এলাকায় নানামুখী জটিলতায় পুরো কার্যক্রমই বন্ধ রয়েছে।

অপরদিকে বাস্তবতার আলোকে বরিশাল মহানগরীর পরিবর্তে প্রায় ১৬ কিলোমিটার বাইপাস নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হওয়ায় সে ধরনের অলিখিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া বরিশাল বিমান বন্দর ডাইভার্শন ও ফরিদপুরে একটি প্রতিবন্ধী স্কুলের পুনর্বাসনেও অতরিক্ত অর্থ ব্যয় হবে। সব মিলিয়ে আরো অন্তত ২শ’ হেক্টর বাড়তি ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হচ্ছে। এমনকি পরবর্তীতে পটুয়াখালীতেও পথনকশায় কিছু পরিবর্তন করতে হবে।

সময়মত ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন না হওয়ায় জমির বর্তমান বাজারমূল্য দ্বিগুনেরও বেশি বৃদ্ধিসহ নতুন পথনকশা অনুযায়ী বাড়তি প্রায় ২শ’ হেক্টরসহ ৩ হাজার ৭শ’ হেক্টর জমির মূল্য পরিশোধেই দ্বিগুনেরও বেশি অর্থের প্রয়োজন হবে বলে সড়ক অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

তবে কি কারণে নির্ধারিত সময়ের ৫ বছর পরেও ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হল না, এর জবাব নেই কারো কাছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সড়ক অধিদপ্তরের বরিশাল জোনের দায়িত্বশীল মহলের মতে ভূমি অধিগ্রহণ একটি জটিল বিষয় হলেও এত দীর্ঘ সময় ব্যয় হওয়া উচিত ছিল না। তাদের মতে ৬টি জেলা প্রশাসন এ ভূমি অধিগ্রহণের সাথে জড়িত। বিভিন্ন জেলা প্রশাসনের ল্যান্ড এক্যুইজিশন দপ্তর সংশ্লিষ্টদের অবহেলা ও উদাসীনতার কারণেও অনেক কিছু পিছিয়ে গেছে বলে মনে করছে সড়ক অধিদপ্তরের অনেকেই।

অপরদিকে ২০১৫ থেকে ’১৮ সালের মধ্যে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও পথনকশা অনুযায়ী ২১১ কিলোমিটার মহাসড়কটি ৬ লেনে উন্নীতকরণে ২১ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হলেও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক আরো দুই বছর আগে নতুন করে পথনকশাসহ উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা-ডিপিপি করতে বলেছে। এডিবি’র অর্থে ইতোপূর্বে সমীক্ষা ও পথনকশা প্রস্তুত হওয়ায় দাতা সংস্থাটি এ প্রকল্পে আর্থয়নের আগ্রহ দেখিয়ে আসলেও বাস্তবে কিছুই হচ্ছে না। তবে সম্প্রতি এ লক্ষ্যে একটি খসরা ডিপিপি বহিঃসম্পদ বিভাগে প্রেরণ করা হলেও ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হবার পরেই প্রস্তাবনা দাখিলের কথা বলে তা ফেরত পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে।

এমনকি ভূমি অধিগ্রহণসহ পরিপূর্ণ ডিপিপি প্রনয়ণ এবং চূড়ান্ত অনুমোদেন না করায় এডিবি’র পক্ষ থেকেও এখন তেমন কোনো আগ্রহ দেখান হচ্ছে না বলেও জানা গেছে। নতুন পথনকশা ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষার লক্ষ্যে গত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে সড়ক অধিদপ্তর অনেকটা নির্বকার বলেই মনে হচ্ছে। কবে নাগাদ এসব বিষয় চূড়ান্ত হবে, তাও বলতে পারেননি সংশ্লিষ্ট মহল।

তবে পরিকল্পনা কমিশনের উচ্চ পর্যায় থেকে ইতোপূর্বে সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে। ইতোপূর্বে ‘বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি-এডিপি’র সবুজ পাতায় ‘ফরিদপুর-বরিশাল-পায়রা-কুয়াকাটা জাতীয় মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীত করণ প্রকল্প’টি অন্তর্ভুক্ত করা হলেও চলতি অর্থ বছরে তা বাদ দেয়া হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে সড়ক অধিদপ্তরের বরিশাল জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও ভূমি অধিগ্রহণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের সাথে আলাপ করা হলে তিনি জুনের মধ্যে একটি অংশ ছাড়া অবশিষ্ট অধিগ্রহণ কাজ সম্পন্ন হবে বলে জানিয়েছেন। পাশাপাশি প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ব্যপারেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। এমনকি সড়ক ও সেতু মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বশীল মহলও বরিশাল-ফরিদপুর ও বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কটির উন্নয়নে আশাবাদ ব্যক্ত করলেও বাস্তবতা ভবিষ্যতই বলতে পারবে বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।

TT Ads

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *