TT Ads

দেশের ৫২৬টি স্থানে জরিপ চালিয়ে সর্বোচ্চ মাত্রার শব্দদূষণ রেকর্ড করা হয়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতাল এলাকায়। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ঢাকার পল্লবীর সিরামিক রোড এলাকা। এরপর রংপুরের গুঞ্জন মোড়। সারা দেশে পরিবেশ অধিদপ্তরের চালানো জরিপে উঠে এসেছে এ তথ্য।

চট্টগ্রামের বেসরকারি বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল হাসপাতাল (বিবিএমএইচ) এলাকায় দিনের বেলায় সর্বোচ্চ শব্দের মাত্রা ১১০ দশমিক ৯০ ডেসিবল। রাতে সর্বোচ্চ শব্দদূষণ পাওয়া গেছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায়—১০০ দশমিক ৮০ ডেসিবল। যদিও সাধারণ মানুষের জন্য শব্দের ‘মানমাত্রা’ ৫০ থেকে ৬০ ডেসিবল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাসপাতাল নীরব এলাকা হিসেবে বিবেচিত হলেও সেখানে শব্দদূষণের উচ্চমাত্রা পাওয়া হতাশাজনক।

পরিবেশ অধিদপ্তর ২০২২ থেকে ২০২৫ সময়কালে দেশের ৬৪টি জেলার গুরুত্বপূর্ণ ৫২৬টি পয়েন্টে শব্দদূষণের মাত্রা পরিমাপ করে। পরিবেশ অধিদপ্তরের অধীনে ‘শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও অংশগ্রহণমূলক প্রকল্প’র আওতায় এ জরিপ পরিচালিত হয়। এ জরিপের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রাম ছাড়া ঢাকা, রংপুর, রাজশাহী জেলায় বেশ কয়েকটি এলাকা শব্দদূষণের উচ্চঝুঁকিতে আছে। যানবাহনের চাপ, হর্ন, নির্মাণকাজ ও শিল্প-কারখানা থেকে উৎপন্ন শব্দ সংশ্লিষ্ট স্থানগুলোতে দূষণের মাত্রা বাড়িয়েছে।

জরিপে দিনে ও রাতে আলাদা সময়ে শব্দের মাত্রা পরিমাপ করা হয়। নীরব এলাকায় দিনে শব্দের মাত্রা সর্বোচ্চ ৫০ ডেসিবল ও রাতে ৪০ ডেসিবল, আবাসিক এলাকায় দিনে সর্বোচ্চ ৫৫ ডেসিবল ও রাতে ৪৫ ডেসিবল, মিশ্র এলাকায় দিনে ৬০ ডেসিবল ও রাতে ৫০ ডেসিবল, বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৭০ ডেসিবল ও রাতে ৬০ ডেসিবল এবং ভারী শিল্প এলাকায় দিনে ৭৫ ডেসিবল ও রাতে ৭০ ডেসিবল পর্যন্ত শব্দের মাত্রাকে স্বাভাবিক ধরা হয়।

জরিপে দিনের বেলায় সর্বোচ্চ মাত্রার শব্দ রেকর্ড হয়েছে চট্টগ্রামের বিবিএমএইচ এলাকায়। এ বেসরকারি হাসপাতাল এলাকায় দিনের বেলায় সর্বোচ্চ ১১০ দশমিক ৯০ ডেসিবল মাত্রার শব্দ রেকর্ড করা হয়। যদিও নিয়মানুযায়ী এ জায়গাটি নীরব এলাকা হিসেবে নির্ধারিত, যেখানে শব্দের মাত্রা ৫০ ডেসিবল হওয়ার কথা। এ এলাকায় রাতে যেখানে ৪০ ডেসিবল শব্দের মানমাত্রা থাকার কথা সেখানে পাওয়া গেছে দ্বিগুণের বেশি—৮২ দশমিক ৬ ডেসিবল। দিনে ও রাতে যানবাহনের অতিরিক্ত চাপের কারণে হর্ন ব্যবহার বেশি হওয়ায় এখানে শব্দের দূষণ বেশি বলে জানিয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

ঢাকার পল্লবীর সিরামিক রোড এলাকায় দিনের বেলায় শব্দের মাত্রা ১০৯ দশমিক ২০ ডেসিবল। এ জায়গাটি ভারী শিল্প এলাকা হিসেবে পরিচিত। এখানে দিনে মানমাত্রা ৭৫ ডেসিবলের বিপরীতে পাওয়া গেছে ১০৫ দশমিক ২০ ডেসিবল। শব্দদূষণে তৃতীয় অবস্থানে আছে রংপুরের গুঞ্জন মোড়। এ আবাসিক এলাকায় দিনে শব্দের মাত্রা ১০৫ দশমিক ২০ ডেসিবল, যা মানমাত্রার প্রায় দ্বিগুণ। দিনের বেলায় এরপর সর্বোচ্চ মাত্রার শব্দ রেকর্ড হয়েছে ঢাকার তেজগাঁও এলাকার সাতরাস্তা রাউন্ডঅ্যাবাউট এলাকায়—১০২ দশমিক ১০ ডেসিবল। রাতেও এখানে ৯১ দশমিক ৪০ ডেসিবল রেকর্ড করা হয়। এলাকাটি দিনে ও রাতে শব্দদূষণে ভারাক্রান্ত। এরপর চট্টগ্রামের পাঠানটুলীতে ১০১ দশমিক ১০ ডেসিবল, ঢাকার শান্তিনগরে ৯৭ দশমিক ৩০ ডেসিবল এবং ঢাকার আরামবাগ এলাকায় দিনে ৯৫ দশমিক ৪০ ডেসিবলের শব্দদূষণ হয়।

অন্যদিকে দেশে রাতে সর্বোচ্চ শব্দদূষণ পাওয়া গেছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায়—১০০ দশমিক ৮০ ডেসিবল। অন্যদিকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে আছে যথাক্রমে রাজশাহীর বিন্দুর মোড় এলাকা (১০০ দশমিক ৫০ ডেসিবল) এবং চট্টগ্রামের ওয়্যারলেস এলাকার ডায়াবেটিক হাসপাতালসংলগ্ন এলাকা (৯৯ দশমিক ৫০ ডেসিবল)। চতুর্থ স্থানে থাকা চট্টগ্রামের কালামিয়া বাজারে ৯৯ দশমিক ৫০ ডেসিবল মাত্রার শব্দদূষণ রেকর্ড করা হয়েছে। এরপর যথাক্রমে ঢাকার শ্যামলীতে ৯৪ দশমিক ৫০ ডেসিবল, তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তায় ৯১ দশমিক ৪০ ডেসিবল, সচিবালয় এলাকায় রাতে ৮৮ দশমিক ৭০ ডেসিবলের শব্দদূষণ হয়।

ভূমি ব্যবহার শ্রেণী যথাক্রমে—নীরব, আবাসিক, মিশ্র, বাণিজ্যিক ও শিল্প অঞ্চল বিবেচনা করে দেশের ৬৪টি জেলার ৫২৬টি স্থানে শব্দের মাত্রা পরিমাপ করা হয়। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ১৭০টি জায়গায়, চট্টগ্রাম বিভাগে ৯১টি, রাজশাহী বিভাগে ৪৫টি, খুলনা বিভাগে ৬৫টি, বরিশাল বিভাগে ৪০টি, সিলেট বিভাগে ৩৫টি, ময়মনসিংহ বিভাগে ৩০টি ও রংপুর বিভাগে ৫০টি স্থানে এ জরিপ করা হয়।

এদিকে জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঢাকা নগরীর ফার্মগেটের মনিপুরি পাড়া, মিরপুরের সি ব্লকের ৮নং রোড—এই দুই জায়গায় শব্দের মাত্রা ৫২ ও ৫৬ ডেসিবল। এ দুটি আবাসিক এলাকায় মানমাত্রার কাছাকাছি শব্দ পাওয়া গেছে। তবে ঢাকা নগরীর ৬৮টি পয়েন্টে ৬৬ থেকে ১০০-এর বেশি ডেসিবলের শব্দমাত্রা পাওয়া গেছে। যা মানুষের সহনীয় পর্যায়ের থেকে অনেক বেশি। অন্যান্য জেলার ১০০টি পয়েন্টের মধ্যে মাত্র ১৯টিতে মানমাত্রার শব্দ পাওয়া গেলেও ৮১টি পয়েন্টে অতিরিক্ত মাত্রার শব্দ পাওয়া গেছে।

চট্টগ্রাম বিভাগে ৯১টি স্থানের মধ্যে মাত্র ৯টিতে রাতে শব্দের মাত্রা সহনীয় মাত্রার কম পাওয়া গেছে। আর দিনের বেলায় নগরীর দুটি স্থান শব্দদূষণে শীর্ষ ৫-এর মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে।

চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের (মহানগর) সহকারী পরিচালক মুক্তাদির হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘জরিপ চলাকালে দিনে চট্টগ্রামের বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল হাসপাতাল (বিবিএমএইচ) এবং ওয়্যারলেস এলাকায় রাতে শব্দদূষণের মাত্রা অত্যধিক পাওয়া যায়। এসব এলাকায় গাড়ির চাপ অত্যধিক বেশি থাকায় শব্দদূষণের মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে। কালামিয়া বাজারেও গাড়ির চাপ ও অতিরিক্ত হর্ন ব্যবহারের ফলে অসহনীয় শব্দদূষণ হয়। স্বাভাবিক সুস্থ-সবল মানুষের পক্ষে ৪০ থেকে ৫০ ডেসিবল মানমাত্রার শব্দ সহ্য করার ধারণক্ষমতা আছে। অতিরিক্ত শব্দের কারণে মানুষ বধির হয়ে যাওয়া ছাড়াও দীর্ঘমেয়াদে নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

তিনি আরো জানান, সম্প্রতি শব্দদূষণ কমাতে চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে গাড়িচালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কীভাবে তারা গাড়ির হর্ণ ব্যবহার কমাতে পারবে সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত নগরায়ণ ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে নগরী এলাকায় শব্দদূষণ ক্রমেই বাড়ছে। নির্মাণকাজে ভারী যন্ত্রপাতির ব্যবহার, অপ্রয়োজনীয় ও হাইড্রোলিক হর্ন, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন, উচ্চশব্দের জেনারেটর, আবাসিক এলাকায় শিল্প-কারখানা এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মাইক, সাউন্ডবক্সের অতিরিক্ত ব্যবহার শব্দদূষণের প্রধান কারণ। বিশেষ করে ঢাকা বা চট্টগ্রাম মহানগরীতে যানবাহনের চাপ ও অহেতুক হর্নের কারণে শব্দদূষণ পরিস্থিতি বেশি খারাপ, যদিও জেলা বা উপজেলা শহরে তুলনামূলকভাবে শব্দদূষণের মাত্রা কম।

চিকিৎসকরা বলছেন, মানুষের শ্রুতিসীমার বাইরে যেকোনো উচ্চশব্দই শব্দদূষণ, যা একটি গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি। দীর্ঘদিন এমন পরিবেশে থাকলে শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে স্থায়ীভাবে নষ্ট হতে পারে। পাশাপাশি হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা, মানসিক চাপ ও স্মৃতিশক্তি হ্রাসের মতো সমস্যা দেখা দেয়। শিশু, বৃদ্ধ, গর্ভবতী নারী ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশার মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া তীব্র শব্দে প্রাণী ও জলজ জীবের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

জরিপ কার্যক্রমের পরিচালক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের (ঢাকা মহানগর) পরিচালক ফরিদ উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘৬৪টি জেলায় জরিপ করতে গিয়ে আমরা বিভিন্ন বিষয় দেখতে পেয়েছি। যেখানে মানুষের পদচারণা এবং যানবাহন চলাচল বেশি সেখানেই শব্দের মাত্রা নির্দিষ্ট ডেসিবলের বেশি পাওয়া গেছে। এ মাত্রা মানুষের জন্য খুবই ক্ষতিকর। বিশেষত শিশুদের জন্য। শব্দদূষণ প্রতিরোধে শুধু ডিএমপিতেই ১৭ হাজার জনকে মামলা ও জরিমানার আওতায় এনেছে ট্রাফিক পুলিশ। শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০২৫-এর আওতায় এ মামলা ও জরিমানা করা হয়েছে। মানুষকে মামলা, জেল জরিমানা দিয়ে শব্দদূষণের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব না। মানুষ সচেতন হলে শব্দদূষণ কমে আসবে।

TT Ads

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *