অনলাইন ডেস্কঃ
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ৩১তম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। নতুন দায়িত্ব গ্রহণের পর ঈদের ছুটি শেষে রোববার (৫ এপ্রিল) বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথম কার্যদিবসেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি, প্রশাসনিক গতি, শিক্ষার মানোন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি সময়ের আলোর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেন।
সময়ের আলো : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩১তম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ায় আপনাকে অভিনন্দন। দায়িত্ব গ্রহণের পর কোন বিষয়গুলোকে আপনি সর্বাধিক গুরুত্ব দেবেন?
অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম : আপনাকে ধন্যবাদ। আসলে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় না প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা। শিক্ষার্থীরাই আমার মূল কাস্টমার বলি, সম্পদ বলি তারা আছে বলেই আমরা আছি। তাদের সেবা দান করার জন্যই আমরা কর্মকর্তা, কর্মচারী, শিক্ষক, উপাচার্য, উপ- উপাচার্য সবাই বসে আছি। অতএব আমরা তাদের ভালো থাকাটাই চাইব। তারা ভালো থাকলে আমরা ভালো থাকব। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মজীবনে যেসব দায়িত্ব পালন করেছি, সবসময় শিক্ষার্থীদের কথা বলে এসেছি। দায়িত্ব গ্রহণের পরই আমি শিক্ষার জন্য একাডেমিক পরিবেশ ও নানা সুযোগ-সুবিধা কীভাবে নিশ্চিত করা যায় সেই বিষয়গুলো নিয়ে মিটিং করেছি। শিক্ষার্থীদের নিয়েই তো আমাদের গবেষণা। শিক্ষার্থীরা ভালো থাকবে, গবেষণা করবে, তাদের ক্যারিয়ার বিল্ডআপ হবে, তার মাধ্যমে আমারটাও বিল্ডআপ হবে।
আপনি একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন। বিগত সময়গুলোতে দেখা গেলে অনেকেই ভিসি হওয়ার পর দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে। আপনি কোনটি করবেন?
অবশ্যই আমি একটি দলের আদর্শে বিশ্বাসী। কিন্তু দল করাটা দোষের কিছু না, রাজনীতি করাটা দোষের কিছু না। রাজনীতি আছে বলেই দেশের পরিবর্তন আমরা আশা করি। এখন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আছে। এর আগে কিন্তু রাজনৈতিক গভর্নমেন্ট নেই বলে আমরা বলেছি, কোনো ইনভেস্টমেন্ট নেই, কোনো কিছু নেই। কেন নেই? রাজনৈতিক সরকার ছিল না। রাজনীতি করা দোষের কিছু না, কিন্তু রাজনীতি করার পরে, চেয়ারে বসার পরে আমি রাজনৈতিক মতাদর্শ অনুযায়ী কাজ করি কি না, আমার দ্বারা রাজনৈতিক অন্য মতের লোকজন ক্ষতিগ্রস্ত হয় কি না এটিই দেখার বিষয়। সাম্য, সামাজিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা- এই তিনটির ভিত্তিতে যদি আমি কাজ করতে পারি তা হলে আমি কোন দল করি, কোন মতাদর্শ ধারণ করি তাতে কী আসে যায়।
রেজিস্ট্রার ভবন নিয়ে শিক্ষার্থীদের নানা অভিযোগ। সম্প্রতি এক ঢাবি শিক্ষার্থীর বিদেশে ভর্তির ক্ষেত্রে ডকুমেন্ট ভেরিফাই করাতে গেলে তার কাছে অর্থ দাবি করা হয়েছে যা সামাজিক মাধ্যমে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রেজিস্ট্রার ভবনভিত্তিক নানা সমস্যা সমাধানে কোনো বিশেষ পদক্ষেপ নিচ্ছেন কি না?
ইতিমধ্যেই আপনারা জেনেছেন যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজের গতিশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৭২ ঘণ্টার বেশি কোনো ফাইল কোনো দফতরে পড়ে থাকতে পারবে না- এমন নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ে যে পরিস্থিতি সেটি আমার নলেজে কিছুটা আছে, যেহেতু আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।
দুপুরের পরে কর্মকর্তারা লাঞ্চে গেলে আর কাউকে পাওয়া যায় না- এমন কথাও প্রচলিত আছে। অবশ্যই আমি সেটি করতে দেব না। আমি ইতিমধ্যে মেসেজ দিয়েছি, আমি এখানে চাকরি করতে আসিনি, আমি দায়িত্ব পালন করতে এসেছি। দায়িত্ব পালন কিন্তু নয়টা-পাঁচটা হয় না, দায়িত্ব পালন মানে মাথায় বোঝা থাকে আমায় এটি শেষ করতে হবে। আমি ওপেন ইউনিভার্সিটিতে দায়িত্বে ছিলাম দেড় বছর। আমি চাকরি করিনি, দায়িত্ব পালন করেছি। তাই আমি আমার দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাসাধ্য ভালোভাবে পালন করার চেষ্টা করি।
শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি শিক্ষক মূল্যায়ন চালু করা। ডাকসুরও ইশতেহারেও তাই ছিল। এই বিষয়ে কোনো পরিকল্পনা আছে কি না?
প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কিন্তু ঠিকই শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের মূল্যায়ন করে। এটি দোষের কিছু নয়। তবে সেটি কীভাবে হয় সেই প্রসেসটা আমার দেখতে হবে। এই বিষয়ে বোধ হয় আগের প্রশাসন কিছুটা কাজ করেছিল। বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করব।
প্রায়শই ক্যাম্পাসে বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের এসব নিরাপত্তা ইস্যুতে কোনো বিশেষ পদক্ষেপ নিচ্ছেন কি না?
আমাদের প্রক্টোরিয়াল টিম সবসময় ভিজিল্যান্স থাকে। প্রতিটা মুহূর্তে প্রক্টোরিয়াল টিম কোথায় কীভাবে কাজ করে তা আমরা মনিটর করি। আমরা আশা করি, তারা আগের চেয়ে আরও বেশি দায়িত্বশীল হবে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে আমাদের মিটিং হয়েছে। ক্যাম্পাসের আশপাশে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, শহিদ মিনার) যেন সবসময় আগের চেয়ে বেশি ভিজিল্যান্স থাকেন এ বিষয়ে কথা হয়েছে।
উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানের উন্নয়নের পাশাপাশি আর কোন কোন ক্ষেত্রে অগ্রগতি দরকার বলে মনে করেন?
উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি ডেফিনেটলি কারিকুলামগুলো পরিবর্তন করে যুগোপযোগী করতে হবে এবং লেখাপড়ার পাশাপাশি, ক্লাসের পাশাপাশি আরও এক্সট্রা কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটি বাড়াতে হবে। শিক্ষার্থীরা আসলে লেখাপড়ার চাপে অনেক জর্জরিত হয়ে যায়। তাদের জন্য আরও সাংস্কৃতিক চর্চা, খেলাধুলা- এগুলোর স্কোপ বৃদ্ধি করতে হবে। ডিবেটিং সোসাইটি, সব কালচারাল প্রোগ্রামসহ অন্যান্য যেগুলো আছে সেগুলো বাড়াতে হবে।
উপাচার্য হিসেবে আগামী কয়েক বছরে বিশ্ববিদ্যালয়কে কোন পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান এবং কীভাবে?
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়কে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই মূল পরিকল্পনা। কীভাবে নেব? বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের টপ মোস্ট ইউনিভার্সিটি দেখাতে গেলে আমার ডেফিনেটলি শিক্ষা এবং গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। শিক্ষা আমাদের তো সব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আছে, গবেষণাও আছে। কিন্তু গবেষণার মান যদি বাড়াতে না পারি, ওয়ার্ল্ড ক্লাস গবেষণা যদি করতে না পারি এবং তার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ সুবিধা যদি বৃদ্ধি করতে না পারি তা হলে তো এগিয়ে যেতে পারব না।
তা হলে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আমাকে অবশ্যই ফান্ড কালেকশন করতে হবে। এখন ফান্ড তো আমাদের পরিমিত। সরকার থেকে বাজেট যখন উপস্থাপন করা হয় সেখানে খুবই সামান্য পরিমাণ অর্থ থাকে রিসার্চের জন্য। বছর বছর এটি কমতেই থাকে। এ ক্ষেত্রে আমার চিন্তা- একাডেমির সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রির কোলাবরেশন করা যায় কী করে?
বিভিন্ন জায়গায় ইন্ডাস্ট্রি যাদের আছে তাদের কাছে আমার সহযোগিতা চাইতে হবে। এর বাইরেও বহির্বিশ্বে যেখানে আমাদের স্কোপগুলো আছে সেই স্কোপগুলো বৃদ্ধি করার জন্য আমাকে বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করতে হবে।
আর র্যাঙ্কিংয়ের একটা ব্যাপার আছে যেহেতু বিশ্বের দরবারে আমাদের পৌঁছাতে হলে র্যাঙ্কিংয়ের জন্য এগোতে হবে। র্যাঙ্কিংয়ের ক্ষেত্রে শুধু যে গবেষণা একটা প্যারামিটার, তা নয়। র্যাঙ্কিং ডিপেন্ড করে অনেক প্যারামিটারের ওপর। সব প্যারামিটার যদি উন্নত করতে পারি তা হলে আমি উন্নত বিশ্বের দরবারে বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব।


