TT Ads

অনলাইন ডেক্স
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান ইরান যুদ্ধ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় পরাশক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার মাঝে এক কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি। বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র দেড় মাসের মাথায় একদিকে যেমন মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন উষ্ণতা দেখা যাচ্ছে, তেমনি চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখা নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিল সমীকরণ। প্রশ্ন উঠেছে— ঢাকা কি কোনো বিশেষ মেরুর দিকে ঝুঁকছে, নাকি সবার সঙ্গে বন্ধুত্বের পুরনো নীতিতেই অনড় থাকবে?

বিগত সরকারের পতনের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে পাঠানো শুভেচ্ছা বার্তায় ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ কৌশলের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ওয়াশিংটন এখন ঢাকাকে তাদের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বলয়ে আরও সক্রিয়ভাবে দেখতে চায়। ইতোমধ্যে মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে এই ঘনিষ্ঠতা চীনের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে কি না, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়লেও বেইজিংকে পাশ কাটিয়ে চলা ঢাকার জন্য অসম্ভব। বর্তমানে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং সামরিক সরঞ্জামের প্রধান উৎস। ২০২৬ সালেও চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এবং বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পে বেইজিংয়ের বিনিয়োগ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য। বিশেষ করে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে চীন ও ভারতের মধ্যকার রেষারেষি ঢাকার জন্য একটি বড় ‘লিটমাস টেস্ট’ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক হবে পুরোপুরি ‘ব্যবসায়িক ও উন্নয়নকেন্দ্রিক’।

ক্ষমতার পালাবদল হলেও রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং জ্বালানি খাতে রুশ সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ওয়াশিংটনের কাছে রুশ তেল আমদানির ক্ষেত্রে ভারতের মতো ‘বিশেষ ছাড়’ বা ওয়েভার চেয়েছেন। এটি স্পষ্ট করে যে, মার্কিন বলয়ে থেকেও ঢাকা তার জ্বালানি চাহিদা মেটাতে রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমাতে চায় না। এছাড়া ২০২৬-২৭ মেয়াদে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্বের জন্য রাশিয়ার সমর্থন চেয়েছে বাংলাদেশ, যা দুই দেশের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক আস্থারই বহিঃপ্রকাশ।

সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘আমাদের নীতি হলো সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক, তবে প্রাধান্য পাবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ।’ ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মার্কিন ঘেঁষা বিবৃতির যে সমালোচনা তৈরি হয়েছিল, তা সরকার পরবর্তী শোকবার্তার মাধ্যমে ভারসাম্য করার চেষ্টা করেছে।

সাবেক কূটনীতিকদের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি একটি ‘চেইনের’ মতো। রপ্তানির জন্য আমেরিকা-ইউরোপ যেমন জরুরি, কাঁচামালের জন্য চীন-ভারত ঠিক তেমনি অপরিহার্য। ফলে কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের দিকে পুরোপুরি ঝুঁকে পড়ার ঝুঁকি নতুন সরকার নিতে চায় না। বরং প্রতিটি দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘বাস্তবমুখী ও কৌশলগত’ অবস্থান বজায় রাখাই এখন ঢাকার মূল চ্যালেঞ্জ।

সূত্র/বিবিসি বাংলা

TT Ads

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *