TT Ads

দ্যা ডেইলি বাংলা নিউজ অনলাইন

রাজশাহী অঞ্চল একসময় আখের সবুজ ঢেউয়ে ভরপুর ছিল, সেখানে এখন আখের খেত খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। একদা উত্তরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ আখ চাষ এখন ভয়াবহ পতনের মুখে। রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে-এ চার জেলায় রাজশাহী কৃষি অঞ্চলের গত এক দশকে আখের আবাদি জমি কমেছে প্রায় ৫২ শতাংশ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ অঞ্চলে আখ চাষ হয়েছিল ৪০ হাজার ৮৬৭ হেক্টর জমিতে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে মাত্র ১৯ হাজার ৩৪০ হেক্টরে। উৎপাদনও কমেছে অনুরূপ হারে। ১ দশমিক ৮ কোটি টন থেকে এসেছে ১ দশমিক ১১ কোটি টনে।

এ পতনের মূলে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনি কলগুলোর দীর্ঘস্থায়ী সংকট, উৎপাদন বন্ধ বা সীমিত হওয়া, কৃষকদের পাওনা বিলম্বিত পরিশোধ, উৎপাদন খরচ আকাশছোঁয়া বৃদ্ধি এবং আমদানি করা সস্তা চিনির বাজার দখল।

কৃষকরা বলছেন, আখ চাষ এখন আর লাভজনক অবস্থায় নেই; বরং ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে অনেকেই আখের জমিতে আম বাগান, গম, ভুট্টা বা সবজি চাষ করছেন। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে উত্তরাঞ্চলের আখভিত্তিক কৃষি অর্থনীতি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, আর দেশের চিনি বাজার আরো বেশি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়বে, যা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।

স্বাধীনতার পর থেকে রাজশাহী অঞ্চল আখ চাষের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল। ধান-গমের পাশাপাশি আখ ছিল কৃষকদের নগদ আয়ের অন্যতম উৎস। দীর্ঘ ১০-১২ মাসের চাষে ভালো ফলন পাওয়া যেত, আর স্থানীয় চিনি কলগুলোয় সরাসরি আখ সরবরাহ করে কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পেতেন। রাজশাহী সুগার মিলস, নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস, এসব কারখানা অঞ্চলের অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে রাখত। হাজার হাজার কৃষক পরিবারের জীবিকা, পরিবহন শ্রমিক, আড়তদার, ছোট ব্যবসায়ী সবাই এই চেইনের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

কিন্তু গত দশকে চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত চিনি কলগুলোর লোকসান বেড়েছে, অনেক কল বছরের পর বছর বন্ধ বা আংশিক চালু থেকেছে। ২০২০ সালে ছয়টি চিনি কল (পাবনা, কুষ্টিয়া, রংপুর, পঞ্চগড়, শ্যামপুর, সেতাবগঞ্জ) আখ মাড়াই বন্ধ করে দেওয়া হয়। রাজশাহী ও নর্থ বেঙ্গল মিলও আখ সংকটে প্রায়ই বন্ধ হয়ে পড়ছে। ফলে কৃষকদের আখ বিক্রির নিশ্চয়তা হারিয়েছে।

রাজশাহী চিনিকলের সাব জোনগুলোয় (কাশিয়াডাঙ্গা, নওদাপাড়া, মিল গেট) আখ চাষ একসময় প্রচুর ছিল। কিন্তু এখন নগরায়ণ, জমি কমে যাওয়া এবং আখ সংকটে উৎপাদন স্বল্প। কৃষকরা অভিযোগ করেন, আখ সরবরাহের পরও পেমেন্ট পেতে ছয় থেকে আট মাস লেগে যায়। এতে ঋণের চাপ বাড়ে, পরের মৌসুমের চাষে অর্থ সংকট দেখা দেয়।

দুর্গাপুর উপজেলার কৃষক লুতফর রহমান বলেন, আগে আখ চাষ করে ভালো লাভ হতো। এখন সার-কীটনাশক-শ্রমিকের দাম বেড়েছে, কিন্তু আখের দাম সেই অনুপাতে বাড়েনি। চিনিকলে দিলে পয়সা পেতে দেরি হয়। তাই আমরা আমবাগান বা গমের দিকে ঝুঁকেছি।

নাটোরের লালপুরে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল ২০২৫-২৬ মৌসুমে নির্ধারিত সময়ের দুই সপ্তাহ আগে বন্ধ হয়ে গেছে আখের অভাবে। এমন ঘটনা কৃষকদের আস্থা আরও ভেঙেছে।

আখ একটি দীর্ঘমেয়াদি ফসল। জমি প্রস্তুতি, রোপণ, সেচ, সার (ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, জিপসাম), আগাছা নিয়ন্ত্রণ, শ্রমিকÑসব মিলিয়ে খরচ অনেক। গত কয়েক বছরে সারের দাম দু-তিনগুণ বেড়েছে, শ্রমিক মজুরি বেড়েছে, জ্বালানি-পরিবহন খরচও বেড়েছে। কিন্তু আখের মূল্য সেই হারে বাড়েনি। ফলে লাভের মার্জিন কমে গেছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আখ চাষে প্রতি হেক্টরে খরচ দু-তিন লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়, কিন্তু ফলন ও দামের অনুপাতে লাভ কম। অন্যদিকে আম চাষে একবার লাগালে ১৫-২০ বছর ফলন পাওয়া যায়Ñখরচ কম, লাভ বেশি।

রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম বাগানের বিস্তার ঘটেছে ব্যাপকভাবে। বাঘা, পুঠিয়া, গোদাগাড়ীতে আখের জমিতে আম চাষ করা হচ্ছে। বরেন্দ্র অঞ্চলে গম, ভুট্টা, সবজি চাষ বেড়েছে। এসব ফসল স্বল্পমেয়াদি, ঝুঁকি কম এবং বাজার সহজলভ্য।

দেশের চিনির বড় অংশ এখন আমদানি করা হয় ব্রাজিল ও ভারত থেকে। অনেকটা সস্তায় আমদানি করা হয়। দেশীয় উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে। রাজশাহী চিনিকলে এক কেজি চিনি উৎপাদনে খরচ ৪০৫ টাকা, কিন্তু বিক্রি হয় ১০০ টাকায়। এতে বিশাল অঙ্কের লোকসান গুনতে হয়।

আখ চাষ কমায় এলাকার পরিবহন শ্রমিক, আড়তদার, ছোট ব্যবসাÑসবাই ক্ষতিগ্রস্ত। গ্রামীণ অর্থপ্রবাহ কমেছে, কর্মসংস্থান হ্রাস পেয়েছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চিনি কল আধুনিকায়ন করতে হবে (যান্ত্রিক ত্রুটি কমানো, দক্ষতা বাড়ানো)। কৃষকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। পেমেন্ট সময়মতো দিতে হবে। আখভিত্তিক শিল্প (গুড়, জৈব জ্বালানি, ইথানল) সম্প্রসারণ করতে হবে। স্বল্প সুদে ঋণ, বীমা, আধুনিক চারা সরবরাহ করতে হবে। আমদানি নিয়ন্ত্রণ করে দেশীয় উৎপাদনকে সুরক্ষা দিতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষকরা ঐতিহ্য বনাম অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দ্বিধান্বিত। যদি সরকারি নীতি পরিবর্তন হয়, চিনি কল ঘুরে দাঁড়ায়, তাহলে আখ চাষ ফিরে আসতে পারে। অন্যথায় এই ঐতিহ্যবাহী ফসল রাজশাহীর কৃষি ইতিহাস থেকে হারিয়ে যেতে পারে। তাদের মতে, রাজশাহীর আখ চাষ শুধু একটি ফসলের গল্প নয়, এটি হাজার হাজার পরিবারের জীবন, অঞ্চলের অর্থনীতি এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তার গল্প। এখনই সময় সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার, তাহলে হয়তো আখশিল্প বাঁচতে পারে বলে আশা করছেন রাজশাহীর আখচাষিরা।

TT Ads

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *