অনলাইন ডেষ্কঃ
১২ থেকে ১৫ কেজি ওজনের একটি তরমুজ কৃষকের জমি থেকে বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১২০ টাকায়। কৃষকের স্থানীয় বাজার কিংবা ঢাকা সবখানেই ভোক্তাকে একই তরমুজ কেনায় গুনতে হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৬০০ টাকা। এতে করে কৃষকের উৎপাদন খরচের টাকা না উঠলেও মিলেমিশে তরমুজের লাভ যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী বিক্রেতাদের ঘরে। একই সঙ্গে যে তরমুজ কৃষকের জমি থেকে বিক্রি হচ্ছে পিস হিসেবে, সেই একই তরমুজ ঢাকার বাজারে বিক্রি হচ্ছে কেজি দরে, যা বিক্রেতাদের ব্যাপক লাভের সুযোগ করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, যেসব অঞ্চলে তরমুজ বেশি উৎপাদন হয়, তার একটি পটুয়াখালী। সেখান থেকে ঢাকায় নিয়মিত তরমুজের সরবরাহ আসছে। পটুয়াখালীর ৫০ বছর বয়সী কৃষক মো. কুদ্দুস হাওলাদার বাউফল উপজেলার কালাইয়া ইউনিয়নের কৃষক। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও তিনি ১৪ একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। যেখানে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮ লাখ টাকা। তবে তরমুজের দাম না থাকায় তিনি মাত্র দুই লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করতে পেরেছেন। এ অবস্থা থাকলে জমির সব তরমুজ বিক্রি করে খরচের অর্ধেকও উঠবে না।
তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাজার নিম্নমুখী, তাই তিনি তরমুজ বিক্রি করতে পারছেন না। খেতেই নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অথচ বাজারে কৃষকের কাছ থেকে কেনা ৭০ থেকে ৮০ টাকার একেকটি তরমুজ ৫০০ টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে।
কুদ্দুস হাওলাদারের মতো একই অবস্থা বাউফলের তরমুজচাষিদের। শুধু বাউফলেই নয়, ফেনিসহ বিভিন্ন জেলার তরমুজচাষিরা নিজেদের উৎপাদন খরচই ওঠাতে পারছেন না।
জানা গেছে, তরমুজ ক্ষেতে প্রতিনিয়ত মিঠাপানির প্রয়োজন হয়। পানি ঠিকভাবে না দিতে পারলে রোদের তাপে ফল ফেটে যায়। এ বছর বাউফলের পানিতে বেশ লবণাক্ত তা দেখা দেওয়ার কারণে কৃষক ঠিকভাবে পানি দিতে পারছে না। মিঠাপানি না পেয়ে বাধ্য হয়ে তরমুজ ক্ষেতে লবণাক্ত পানি দিচ্ছেন। ফলে তরমুজগাছ লালচে হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া বিক্রিতে দেরি হওয়ার কারণেও গাছে নানা রোগবালাই দেখা দিয়েছে। অপেক্ষায় আছেন কৃষক, কখন মূল্যবৃদ্ধি পাবে। ততক্ষণে হয়তো ফসল পানিতে তলিয়ে যাবে, এমন আশঙ্কা কৃষকদের।
কয়েকটি জেলার কৃষকরা জানান, সবচেয়ে ভালো মানের ১০০ তরমুজ ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে কৃষকের জমি থেকে। তবে এই দাম পাওয়া কৃষকের সংখ্যা হাতেগোনা। বেশিরভাগ কৃষকই ১০০ তরমুজ ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা হিসেবে বিক্রি করছেন। সেই হিসেব করলে প্রতিটি তরমুজের দাম ৩০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১২০ টাকায় কিনছেন ফড়িয়া।
অথচ স্থানীয় বাজারগুলোতেই তরমুজ বিক্রি হচ্ছে প্রতি পিস ১০০ (আকারে ছোট) টাকা থেকে ৬০০ (১৩-১৪ কেজি) টাকা পর্যন্ত। কৃষকের খরচ না উঠলেও লাভের পুরোটাই যাচ্ছে বিক্রেতাদের পকেটে। এতে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হওয়ায় চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষকরা।
এ অবস্থা শুধু স্থানীয় পর্যায়েই নয়, ঢাকাতেও। ঢাকার বিক্রেতারা আবার আরও একধাপ এগিয়ে। তারা আবার পিস হিসেবে কেনা তরমুজ বিক্রি করছেন কেজি দরে। প্রতি কেজি তরমুজ ঢাকার বাজারে ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় খুচরা দোকানগুলোতে বিক্রি হচ্ছে। যদিও কারওয়ানবাজারের মতো পাইকারি বাজারে এটা ২৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়। এতে করে ৫ থেকে ৬ কেজি ওজনের যে তরমুজ কৃষক বিক্রি করছেন সর্বোচ্চ ৫০ টাকায়, সেটি ঢাকায় ২০০ টাকা বা তারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পটুয়াখালী থেকে বড় ট্রলারে করে ৫ থেকে ৮ হাজার পিস তরমুজ ঢাকায় আসছে। যার ভাড়া পড়ে ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা। এখান থেকে পাইকারি বাজার হয়ে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পৌঁছাতে প্রতিটি তরমুজে খরচ যোগ হয় আরও চার থেকে পাঁচ টাকা।
অর্থাৎ সর্বোচ্চ দাম ১২০ (১২-১৫ কেজি ওজনের) টাকায় কেনা একটি তরমুজের ঢাকায় আসতে খরচ পড়ে ১২৫ টাকার আশপাশে। কিন্তু এই একই তরমুজ খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে যখন ভোক্তা কিনছেন, তখন তাকে গুনতে হচ্ছে ওজনভেদে ৪৫০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে।
ঢাকার কারওয়ানবাজারের এক আড়তদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, আড়তদাররা পিস হিসেবে কিনে পিস হিসেবেই বিক্রি করছে। তবে পরিবহনের ক্ষেত্রে অনেক তরমুজ নষ্ট হয়। সেটার খরচ যোগ করে নামমাত্র লাভেই আড়তদাররা বিক্রি করেন।
কারওয়ানবাজার সবজির আড়তদার সমিতির সভাপতি ইমরান মাস্টার বলেন, ‘এটা আসলে ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। আমাদের যদি একটা স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা তৈরি করা যায়, তাহলে এই যে দামের ফারাক সেটা কমে আসবে।’
বাড্ডার এক ফলের দোকানি আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আড়ত থেকে তরমুজ আনলে সেগুলো ভেতরে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু বাজার এমন প্রক্রিয়া চালু হয়েছে, তরমুজ কেটে না দিলে কেউ নিতে চান না। এখন ১০০ তরজুম আনলে সেখানে একটা অংশ এমনিতেই লাল কম থাকে, যা গ্রাহকের কাছে আর বিক্রি হয় না। এই সংখ্যাটা একেবারেই কম না। এ জন্য আমাদের একটু বেশি দাম দিয়েই বিক্রি করতে হয়। এর জন্য সিস্টেম অনেক ক্ষেত্রে দায়ী।
এদিকে কৃষকদের অভিযোগ, উপজেলা কৃষি অফিস থেকে কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধা তারা পান না। এমনকি পরামর্শ পর্যন্ত দেওয়া হয় না তাদের। স্থানীয়দের মতে, কাঁচামাল পচনশীল পণ্য হওয়ায় কিছু লোকসান ধরা হয় ফল-ফসলের জন্য। কিন্তু তরমুজ পচনশীল পণ্য নয়। এটি কোনো ধরনের প্রক্রিয়াজাতকরণ ছাড়াই স্বাভাবিক তাপমাত্রায় মাসখানেক সংরক্ষণ করা যায়।
তরমুজচাষি নুরুল ইসলাম গাজী বলেন, ‘প্রতি কানি (২ দশমিক ৪০ একর) জমি তৈরি করতে দুই লাখ টাকা খরচ হয়। ২০ কেজির একটি ফলের জন্য যে খরচ, আধা কেজির একটি ফলের জন্যও একই খরচ। ফলে আমরা যে ফলটি ৪০ টাকা থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি করছি, তার গড় করলে একটি ফলের দাম ৮০ থেকে ৯০ টাকা হয়। কিন্তু ওই তরমুজটি বাজারে ২০০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মধ্যস্বত্বভোগীরা ফায়দা নিচ্ছেন।
তিনি বলেন, সরাসরি যদি আমরা বাজারের সঙ্গে যুক্ত হতে পারতাম, তাহলে আমরা ন্যায্যমূল্য পেতাম। তিনি আরও বলেন, প্রায় ১৫ একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছি এ বছর। এর মধ্যে ১৭০০ পিস তরমুজ বিক্রি করেছি, যার বাজারমূল্য মাত্র এক লাখ ৭০ হাজার টাকা। বাকি টাকা কীভাবে ঘরে তুলব, সেটি নিয়ে চিন্তায় আছি। ক্ষেতে তরমুজ নষ্ট হয়ে হচ্ছে।’
পটুয়াখালীর আমির হোসেন নামের অপর এক চাষি জানিয়েছেন, ‘১২-১৫ কেজি ওজনের একটি তরমুজ ক্ষেত থেকে ১২০ টাকায় কাটা হয়; অথচ বাজারে গিয়ে দেখি সেই তরমুজ ৫০০-৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাহলে আমরা কৃষক কেন এত কষ্ট করে তরমুজ চাষ করব বলেন?’
বাউফল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মিলন বলেন, ‘আমরা তরমুজচাষিদের নিয়ে বেশ কয়েকটি বৈঠক করেছি। সেখানে কৃষি পরামর্শ দিয়েছি। তবে তরমুজের ওপর কোনো প্রণোদনা নেই। পানিতে লবণাক্ত তার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাকে কেউ বলেনি। বললে হয়তো পরীক্ষা করে দেখা যেত। পরের বছর এ বিষয়ে নজরদারি থাকবে।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর দেশে প্রায় ৫ লাখ টন তরমুজ উৎপাদন হয়।


