অনলাইন ডেষ্কঃ
দেশের অন্যতম বিদ্যুৎ উৎপাদন অঞ্চল হয়েও বরিশাল বিভাগ আজ ভয়াবহ লোডশেডিং, বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত। উৎপাদন কেন্দ্রের পাশেই বসবাস করেও দিনের পর দিন বিদ্যুৎবঞ্চিত থাকছেন সাধারণ মানুষ। স্থানীয়দের ভাষায় এ যেন বাতির নিচেই অন্ধকার।
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় অবস্থিত দেশের বৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং পটুয়াখালী সুপার আলট্রা ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আরপিসিএল-নোরিনকো কেন্দ্র। এসব কেন্দ্রকে ঘিরে ধুপাড়া, ধানখালী, চর নিশানবাড়িয়া ও নিশানবাড়িয়া এলাকায় একসময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের আশা জেগেছিল। কিন্তু বাস্তবতা এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশের এলাকাগুলোতেই দিনে ৫ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।
এই সংকট শুধু কলাপাড়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলা, ৪১টি উপজেলা ও ৪ হাজার ১৬৩টি গ্রামে দিন-রাত মিলিয়ে একাধিকবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবে পড়াশোনা করতে পারছে না, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা নেমে এসেছে এবং তীব্র গরমে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
পটুয়াখালী দুমকী উপজেলার শিয়ালগুনি ইউনিয়নের বাসিন্দা আবুল কালাম মাস্টার বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রের এত কাছাকাছি থেকেও দিনে পাঁচ ঘণ্টা লোডশেডিং সহ্য করতে হচ্ছে। তীব্র গরমে রাতের ঘুমও হারাম হয়ে যাচ্ছে। কয়েকদিন ধরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
বরিশাল নগরীর ব্যবসায়ী রিয়াজুর কবির বলেন, দিনে ৮ ঘণ্টা ও রাতে ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। ঘুমানো যায় না, কাজ করা যায় না জীবনযাপন কঠিন হয়ে গেছে। সন্ধ্যা ৭টার মধ্যেই দোকান বন্ধ করতে হচ্ছে। দিনে ৩-৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে ব্যবসা চালানো অসম্ভব।
বরিশাল নগরীর ফজলুল হক অ্যাভিনিউয়ের ব্যবসায়ী আকতার হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালাতে হয়, এতে খরচ বাড়ে। তাহলে লোডশেডিং দিয়ে আসলে কী লাভ হলো। দিনে-রাতে ৪-৫ বার লোডশেডিং হচ্ছে। শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন। বরিশালে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এখন স্বপ্নের মতো।
বিদ্যুৎসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল অঞ্চলে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে প্রায় ২১ লাখ ৬৫ হাজার এবং ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) এর মাধ্যমে প্রায় ৪ লাখ ৭০ হাজার গ্রাহক বিদ্যুৎ পাচ্ছেন। ৪২টি উপজেলায় দিনে ৬৫০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যায় ৮৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে ৩৫-৪০ শতাংশ। ফলে দিনে-রাতে চার থেকে পাঁচ দফা লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।
এ অঞ্চলে একাধিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থাকা সত্ত্বেও সবগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালু নেই। কয়লাসংকট ও কারিগরি জটিলতায় কিছু কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন কেন্দ্র মিলিয়ে প্রায় ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, যা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল।
অন্যদিকে, গ্রিড ও সাব-স্টেশন সংকটও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। বরিশালের রূপাতলী ও কাশীপুর কলাডেমা সাব-স্টেশনে চাহিদার তুলনায় উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। একপর্যায়ে প্রায় ৬৪ মেগাওয়াট ঘাটতি দেখা গেছে। এতে নগর এলাকায় কিছুটা সরবরাহ বজায় থাকলেও গ্রামাঞ্চলে ৫০ শতাংশেরও কম বিদ্যুৎ দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে কৃষিতেও। বরিশাল অঞ্চলে প্রায় ৪ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের সেচ কার্যক্রম ঝুঁকির মুখে রয়েছে। টানা ১২৭ দিন বৃষ্টির অভাবে কৃষকরা চরম উদ্বেগে ছিলেন। তবে সম্প্রতি সামান্য বৃষ্টিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। এতে সেচের প্রয়োজন কিছুটা কমবে এবং জ্বালানি ব্যয় হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলে উৎপাদিত প্রায় ৩৫ লাখ টন তরমুজের মধ্যে এখনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাঠে রয়েছে। ডিজেল সংকট ও পরিবহন সমস্যার কারণে সময়মতো বাজারজাত করতে না পারায় কৃষকরা ক্ষতির আশঙ্কায় ছিলেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিবহন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।
জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সামান্য বৃষ্টি বা বৈরী আবহাওয়ায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিচ্ছে। সম্প্রতি মঙ্গলবার রাত সোয়া ১১টা থেকে রাত প্রায় আড়াইটা পর্যন্ত বরিশাল নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েন। এর আগে নবগ্রাম রোড সাব-স্টেশনে রক্ষণাবেক্ষণের পরও পুনরায় ত্রুটি দেখা দেয়।
বরিশাল নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব ডা. মিজানুর রহমান বলেন, লোডশেডিং হলে আগাম জানানো উচিত। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে যায়। পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা করা জরুরি। উৎপাদন, সরবরাহ ও বিতরণ এই তিন খাতের সমন্বয় না থাকায় বরিশাল অঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
এ বিষয়ে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি ওজোপাডিকোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পরিতোষ চন্দ্র সরকার জানান, উৎপাদন কেন্দ্রের জটিলতা ও জাতীয় গ্রিডের সীমিত সরবরাহের কারণে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সমস্যা সমাধানে প্রকৌশলীদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।


